"কিন্তু কেন?" - আরিফের তীক্ষ্ণ স্বর রাহেলার কানে গিয়ে বাজে।
- আমি বলছি তাই।
- তুমি বললেই সব হবে?
- আমার কথাতে যদি না হয় তবে আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন? নিজে যা ভালো মনে করিস সেটাই কর।
- সেটাই করব। আরিফ আরো ঝাঁঝালো গলায় জবাব দেয়। তার মেজাজ তখন তুঙ্গে উঠেছে।
- আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ...। পেলে-পুষে একটা জানোয়ার বড় করেছি।
আরিফ দড়াম করে দরজা লাগিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। পেছনে ফিরলে হয়ত দেখতে পেত তার মায়ের রাগের বদলে কান্না কান্না চেহারা।
রাহেলার বয়স এখন প্রায় পঞ্চান্ন। এই বয়সে ছেলের সাথে ঝগড়াঝাটি করতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু ছেলেটা গোল্লায় গেছে। যখন তখন উদ্ভট আবদার করে বসে। এখন নাকি সে ব্যবসা করবে, সে জন্য তার টাকা দরকার। বাবার কাছ থেকে সে টাকা চায়। প্রতিদিন এসে মায়ের সাথে ঝগড়াঝাটি করছে এই কারনে। রাহেলা অবশ্য তার স্বামীকে এই ব্যপারে এখনও কিছু জানাননি। বাপের সাথে ছেলের সম্পর্ক এমনিতেই ভালো না। এই কথা বললে বাসায় আবার কি তুলকালাম বাঁধে কে জানে?
মনির সাহেব দোকান থেকে খেতে আসেন দুপুরবেলা। বাসার পাশেই একটা ফার্মেসি দিয়েছেন নিজের পেনশনের সব টাকা খরচ করে। সময়ও কাটে আর বাড়তি কিছু ইনকামও হয়। শুধু পেনশনের উপর ভর করে থাকলে চলত না। মেয়েটা এইবার অনার্স ফাইনাল দিচ্ছে। তার বিয়ে দিতে হবে, সংসারের খরচ আছে। ছেলেটা কিছু করে না। রিটায়ার করার পরেও তাই সংসারের হাল তাকেই ধরতে হচ্ছে।
রাহেলা স্বামীকে টেবিলে খাবার দিয়ে বিছানায় গিয়ে একটু শুয়ে ছিলেন। তার মন মেজাজ ভাল না। খেতে বসে নিম্মিকে জিজ্ঞেস করলেন মনির সাহেব- "তোর মা কই?"
- শুয়ে আছে। শরীর খারাপ লাগছে বলে। নিম্মি মোবাইল দেখছে আর খাচ্ছে।
মনির সাহেবের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। তিনি বুঝতে পারছেন কি কারনে তার স্ত্রীর শরীর খারাপ। নিশ্চিত বেজন্মাটা আবার মার সাথে চিল্লাফাল্লা করেছে। আর রাহেলাও তার স্বভাব সুলভ ভাবে কান্নকাটি করেছে।
- খেতে বসে মোবাইল গুতাচ্ছিস কেন?
- কই...!
- দেখতেই পাচ্ছি আমি, আবার তর্ক করিস? মনির সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাঁকান নিম্মির দিকে।
নিম্মি হাতের মোবাইল নামিয়ে রেখে বাবার দিকে তাঁকিয়ে একটা হাসি দেয়। এই হাসি দিলে বাবা তার উপর রাগ করে থাকতে পারবেন না।
- সরি বাবা। কিন্তু মায়ের রাগ আমার উপর ঝাড়ছ কেন?
- তোর মায়ের উপর রাগ করেছি কে বলল?
- কেউ না, আমি আন্দাজ করলাম। মেয়েদের আন্দাজ খুব ভালো হয়।
- তুই সবজান্তা?
- সবজান্তা না... তবে তুমি কখন কেন রাগ কর এটা আমার জানা আছে।
- এখন কি জন্য রাগ করেছি?
- মা খাবার টেবিলে নাই এজন্য। মা কান্নাকাটি করে গাল ফুলিয়ে বসে আছে।
- তোর ভাই মানুষ হবে না। বাপের টাকায় খায়-দায় ঘুরে ফিরে, কোন কাজে করে না। তার প্রধান কাজ হচ্ছে বাসায় এসে মাস্তানি করা। আজকে আসুক তার মাস্তানি বের করতেসি।
- ওকে একটা বিয়ে দিয়ে দাও!
- মানে?
- শুনেছি লাফাঙ্গা ছেলেদের বিয়ে দিয়ে দিলে তারা নাকি শুধরে যায়।
- কোথায় শুনেছিস?
- এই যে নাটক সিনেমায় বলে...। নিম্মি ফিক করে হেসে দিল।
- জীবনটা নাটক সিনেমা না। তোর ভাই কিছু করে না। একে বিয়ে করবে কে?
- কেউ না কেউতো করবে।
- তুই বেশি পাকনামো কথা বলছিস দেখি। তোর বিয়ে আগে দেয়া দরকার।
- তা দিতে পারো...। পড়াশোনা করতে বেশি ভাল লাগছে না।
মনির সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো। ঠিকমত টিউটর দিতে পারেন নাই স্কুল কলেজে থাকতে। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন প্রথম-দ্বিতীয় হয়ে যেত মেয়েটা। এখনও অসম্ভব ভাল রেজাল্ট করে ইউনিভার্সিটিতে। তিনি নিঃশব্দে বাকি খাওয়া সারলেন। দুপুরে খাবার পর একটু ঘুমান তিনি। আজকে ঘুমাতে গিয়ে দেখেন রাহেলা ঘুমিয়ে আছে বিছানায়। তাকে আর জাগালেন না। ড্রইং রুমে গিয়ে সোফায় বসলেন।
- তোমাকে চা দেই বাবা?
কখন যে নিম্মি এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে খেয়াল করেননি।
- তোর পড়াশোনা নেই?
- পড়াশোনা আজীবনই থাকবে বাবা। কিন্তু এই ভর দুপুরে বই নিয়ে পড়ে থাকার মানুষ আমি না।
- তা ঠিক। এখন বিশ্রামের সময়। মাঝে মধ্যে মাথাটাকেও রেস্ট দিতে হয়।
- তুমি আজকে ঘুমাতে গেলে না?
- নাহ... তোর মা ঘুমাচ্ছে। দেখে খুব মায়া লাগল। পাশে শুতে গেলে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। এমনিতেই সারাদিন মেলা যন্ত্রনায় থাকে। একটু আরাম করে ঘুমাক।
- তুমি আমার রুমে গিয়ে ঘুমাতে পারো বাবা। নিম্মি হাসিমুখে বলে।
- নাহ... এখানেই বসি আজকে। একদিন একটু নিয়ম ভাঙ্গলাম।
- আচ্ছা বসো, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি।
নিম্মি চট করে গেল আর ফিরে এল দু'কাপ চা হাতে নিয়ে। চা সে বানিয়েই রেখেছিল।
- এত জলদি চা বানানো হয়ে গেলো?
নিম্মি হাসল, তার বাবা ভোলানো হাসি। মেয়েরা একেকজন পুরুষের জন্য একেক রকম হাসি মজুদ রাখে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে সে এই হাসি ব্যবহার করে। বাবার জন্য মজুদ করা হাসি ভাইকে দেখায় না। আবার স্বামীর জন্য মজুদ করা হাসি অফিসের বসকে দেখাবে না। বেশিরভাগ বোকা পুরুষ এই হাসি গুলিয়ে ফেলে।
- তোর পরীক্ষা কবে?
- আমাকে দেখলেই কি তোমার পরীক্ষা আর পড়াশোনার কথা মনে হয়? চা বানিয়ে আনলাম, দুজনে বসে চা খাবো আর আড্ডা দেবো।
- ভুল হয়েছে। কর গল্প কর।
- এখন আর ইচ্ছা করছে না। নিম্মি কপট রাগ দেখায়।
- আমি দুঃখিত। তোর চা মজা হয়েছে। তোর মায়ের থেকেও ভালো।
নিম্মি হেঁসে দেয়। "ভাগ্যিস মা শোনে নাই... শুনলে এখনই তোমার খবর ছিল।" মনির সাহেব স্মিত হাসেন। মেয়ের চা আসলে জঘন্য হয়েছে। তাকে খুশি করার জন্য ভালো বলেছেন তিনি।
- তোমাকে একটা সিরিয়াস কথা বলব বাবা? মাকেও বলিনি, তোমাকেই আগে বলছি।
- কি কথা? মনির সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান। ছেলেদের সিরিয়াস কথায় কান না দিলেও ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে যদি বলে সিরিয়াস কথা আছে, তবে ঘটনা সাংঘাতিক না হয়ে যায় না।
- কোন রিএক্ট করতে পারবে না। শুধু শুনে যাবে।
- এত ভনিতা করছিস কেন বলে ফেল!
- আমি একটা স্কলারশিপ পেয়েছি।
- মানে?
- দেশের বাইরে একটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি ফেলোশিপ এর জন্য সিলেক্ট হয়েছি। তোমাকে বুঝিয়ে না বললে তুমি বুঝবে না।
- তা না বুঝতে পারি, আমার তো আর অনার্সের পরে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু এটাতো ভালো খবর, তুই এত মিনমিন করে বলছিস কেন?
- গতকাল রাতেই অফার লেটার পেলাম। ফুল ফান্ডেড। ছয় মাসের মধ্যে যেতে হবে। তার আগে জার্মান ভাষা শিখতে হবে।
- জার্মানিতে?
- ইয়েস বাবা। কিন্তু তুমি রাজি হবে কিনা, মা কি বলবে... এইসব ভেবে কাউকে বলিনি।
- তুই যেতে চাস?
- চাই বলেই তো এপ্লাই করেছি বাবা।
- পড়াশোনা করাটা দোষের কিছু না। আরো বেশি করে করবি। তোর মাকে আমি রাজি করাবো।
নিম্মি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বাবা অনুমতি দিলে সে জাহান্নামেও যেতে পারবে। আর কারো পরোয়া করতে হবে না।
- কিন্তু তোর মা নিশ্চিত বলবে বিয়ে করে যাবার কথা। এত বড় একটা খুশির খবর এই বোকা মহিলা বুঝবে না।
- তুমি বুঝিয়ে বললেই বুঝবে। বিয়ে করার জন্য বয়স চলে যাবে না।
মনির সাহেব কিছু বললেন না। মেয়ে প্রথমে তাকে এসে খবরটা দেয়াতে ভালো লাগছে। এমনিতেই ছেলে-মেয়ে দুটো তার মা ঘেঁষা। তাকে ভয়ে কিছু বলে না। কিন্তু নিম্মি চলে যাবে অনেক দূরের দেশে এটা ভেবে আবার মন খারাপ হচ্ছে। আচ্ছা বিয়ে দিলেওতো মেয়েটা পরের বাড়িতে চলে যেত। এর চেয়ে দেশের বাইরে গেলে ভালো একটা জীবন পাবে। এই ছাতার দেশে আছে কি? ছেলেটাতো গোল্লায় গেছে। মেয়েটা যদি আরো পড়তে চায় বাঁধা দেবার কোন কারন দেখেন না তিনি।
- আমার অনেক আনন্দ হচ্ছেরে মা। তুই তোর মাকে ঘুম থেকে তুলে খবরটা এখনই দে।
- এত তাড়াহুড়ার কি আছে। আমিতো আজকেই চলে যাচ্ছি না। আরো মাস চারেক সময় লাগবে।
- তুই যে নিজে নিজে কাউকে না জানিয়ে এত কিছু করে ফেলেছিস, আমার মেয়েটা যে কখন এত বড় হয়ে গিয়েছে!
- বাবা...দয়া করে এখন কান্না শুরু করবে না।
- আরে না... কান্না করব কেন? মনির সাহেবের আসলেই কান্না পাচ্ছিল, তবে সামলে নিলেন। বললেন "তোর চা জঘন্য হয়েছে। এখন আরেক কাপ বানিয়ে নিয়ে আয়।"
- আমি মাকে ডেকে দিচ্ছি। তুমি তোমার বউয়ের হাতের চা খাও। নিম্মি বাবার হাত থেকে চায়ের কাপ ছোঁ মেরে নিয়ে গেল।
------- 🕒-------
আরিফ বাসায় ঢুকল চুপি চুপি সন্ধ্যা বেলা। গিয়েই নিজের রুমে ঢুকে গেল। সারাবাড়ি পোলাওয়ের গন্ধে ম'ম করছে। ঘটনা কি সে বুঝতে পারছে না। ভেবেছিল বাসায় ঢুকলে বাবার কাছে একরাশ বকা খাবে, কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলল না। ঘটনা খুব সুবিধার মনে হচ্ছে না। চুপি চুপি গিয়ে শুয়ে রইল বিছানায়।
খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু মার কাছে এখন খাবার চাওয়া যাবে না। পোলাওয়ের গন্ধে খিদেটা আরো বেশি মাথা চাড়া দিচ্ছে। সে যে অভিমান করে না খেয়ে আছে এটা কেয়ার কর মত লোক এই বাসায় কেউ নেই। মন খারাপ করে সে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়ে রইল বিছানায়।
কিছুক্ষন পরেই রুমের লাইটের সুইচ অন করার শব্দে সে মাথা বের করে দেখল কে এসেছে,... নিম্মি। তার হাতে একটা বাটি। সেখান থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে।
- এই যে পায়েস দিয়ে গেলাম খা।
- আমি খাবো না, নিয়ে যা।
- রেখে যাচ্ছি, না খেলে আর কেউ সাধবে না। নিম্মি পায়েস টেবিলে নামিয়ে রেখে চলে গেল।
নিম্মি চলে গেলে আরিফ উঠে পায়েস খায়। কিন্তু শয়তানটা পানি দিয়ে যায়নি ইচ্ছা করে। টেবিলের উপর বোতলেও পানি নেই। রুম থেকে বের হয়ে পানি আনতে গেলে বাবার রুম পার হতে হবে। এই রিস্ক নেয়া যাবে না। এখন উপদেশ শোনার মত ইচ্ছা হচ্ছে না। আসলে বাবাকে প্রচন্ড পরিমানে ভয় পায় আরিফ। আজকে সকালের ঝগড়ার কথা নিশ্চিত এতক্ষনে তার কানে গেছে। জবাব দিতে দিতে জান বের হয়ে যাবে।
নিম্মি আবার এসেছে। তার হাতে এবার একটা খিচুড়ির প্লেট।
- কিরে বাটি হাতে বসে আছিস কেন? আরো খাবি?
- না...। তুই আমার বোতলে পানি ভরে দিয়ে যা।
- আমি খিচুড়ি রান্না করেছি, টেস্ট করে দেখ কেমন।
- আগে পানি দিয়ে যা।
- আমি তোর চাকর নাকি? নিজে উঠে গিয়ে পানি আনছিস না কেন?
আরিফ করুন চোখে তাঁকায় তার থেকে বয়সে ছোট নিম্মির দিকে। তাকে এখন মায়ের মতই লাগছে।
- বাবা বাসায় নেই। তুই নিশ্চিন্তে খা।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচে আরিফ। সকালের ঘটনার জন্য অনুতপ্ত লাগছে এখন। পেট ভরা থাকায় ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারছে।
- বাবা কোথায় গেছে? ফার্মেসি থেকে বাসায় আসেনি?
- এসেছে আবার বাইরে গেছে। বলে গেছে তোকে যেন কোন দানপানি না দেয়া হয়। আমার নিতান্তই দয়া হচ্ছিলো তাই দিলাম।
- কি রান্না হয়েছে পোলাও? উপলক্ষ্য কি?
- কোন উপলক্ষ্য নাই। বাবা বলেছে রান্না করতে তাই রান্না হয়েছে।
আরিফ কিছু বলে না আর, নিম্মির গমন পথের দিকে তাঁকিয়ে থাকে। সে এই সংসারে নিতান্তই একটা বোঝার মত। খুব মেধাবী ছাত্রও ছিল না। কোনরকমে টেনেটুনে মাস্টার্স শেষ করেছে। চার বছর হয়ে গেছে কোথাও মনমত চাকরি পাচ্ছে না। দুইটা টিউশনি করে এখনও। ব্যবসার চেষ্টা করছে কিন্তু মূলধন পাচ্ছে না। আবার বাবার সাথে ফার্মেসিতেও বসতে ইচ্ছা করে না। এক বন্ধুর সাথে গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা করবে বলে খুব ঘোরাঘুরি করেছে কয়দিন। টাকার অভাবে সেটাও শুরু করতে পারছে না। যা-ই করতে যায় সবাই মূলধনের কথা আগে বলে।
আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না। ঘুম ভাঙে রাত দশটায়। ঘুম ভাঙ্গলেই তার সাধারনত খিদে পায়। বাবা এসেছে কিনা কে জানে! রুম থেকে বের হয়েই বাবার সাথে দেখা হয়ে গেল। মনির সাহেব মাত্র খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলেকে দেখেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন।
- নবাবজাদা ঘুম থেকে উঠেছেন। তার নিশ্চয়ই খিদে লেগেছে?
আরিফ ভাবল একবার বলে, আমি নবাজাদা নই বাবা। নবাবাজাদা হলে আমাকে টিউশনি করে বেড়াতে হোত না। তোমাকেও ফার্মেসি চালাতে হত না।
- মাকে কি বলেছিস তুই? ফ্রি-তে থাকছিস, খাচ্ছিস, গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, আর কি চাস তুই?
আরিফ কোন জবাব দিল না। আবার নিজের রুমে ঢুকে গেল। বয়স তিরিশ পার হয়ে যাবার পর যে ছেলে সংসারের হাল ধরতে না পারে, সে আসলে পুরুষ হয়ে বাঁচে না। তাকে তৃতীয় লিংগ বলা চলে। হয়ত তার থেকেও খারাপ, ওদের তাও সারাদিন ঘুরে ঘুরে কিছু আয় হয়। সংসারে খরচ দিতে পারে। আরিফের সে যোগ্যতাও হয়নি।
রাহেলা নিজের রুমে ছিলেন স্বামীর চিৎকার শুনে বের হয়ে আসলেন। বাপ-বেটা এই রাতে না আবার শুরু করে। একটা দিনও শান্তিতে কাটানো যাচ্ছে না এই ছেলের যন্ত্রনায়।
রাত বারোটার পরে নিম্মি প্লেটে করে পোলাও আর গরম গরম গরুর মাংস নিয়ে আরিফের রুমে আসে। আরিফ বসেই ছিল। নিম্মির হাত থেকে প্লেট নিয়ে বিছানায় রেখে খাওয়া শুরু করল। নিম্মি পানির বোতলে ভরে পানি দিয়ে গেল। আরিফ কিছু বলছে না। একমনে খাচ্ছে।
- খাবার কেমন হয়েছে?
- সবসময় যেমন হয়। আরিফ ছোট্ট করে জবাব দেয়। যেন জগত সংসারের কোন কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না।
- সবসময় কেমন হয়? নিম্মি জিজ্ঞেস করে। সে ভাইয়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে। চোখে কিছুটা মায়া। তার ভাইটা কেন যে আর দশজনের মত হল না। টিউশনি করে কি জীবন চালনো একটা মানুষ।
- ভালো হয়। আমি ফ্রিতে পাই, খাই। ভালোমন্দ দেখার সময় হয়না।
নিম্মির কিছুটা মন খারাপ হয় আরিফের কত্থা শুনে।
- আজকে আমি রান্না করেছি। মা শুধু দেখিয়ে দিয়েছে। যা কিছু খেয়েছিস সন্ধ্যা থেকে আমার রান্না করা। তুই খাসনি তাই তোর জন্য নিজের হাতে নিয়ে এলাম। এখন বল কেমন হয়েছে?
আরিফ গম্ভীর চোখে তাঁকায় বোনের দিকে।
- খাবার ভালো হয়েছে। মনে হয়েছে মার মত তুই রান্না করিস। কিন্তু উপলক্ষ্য কি? আজকে কি তোর জন্মদিন? কোন গিফট দিতে পারব না। টিউশনির টাকা পাইনি এখনও।
নিম্মি কিছু বলে না। তার চোখ টলমল করছে। প্রানপনে চোখের জল ধরে রাখার চেষ্টা করছে সে। সে তার ভাইয়ের চোখের দিকে তাঁকায়। কি সুন্দর একটা ছেলে। মায়া মায়া দুইটা চোখ। কোন বদভ্যাস নেই, রাতে বাইরে আড্ডা দেয় না, সিগারেট খায় না। কারো সাথে প্রেম করার চেষ্টা করে না। কিন্তু মাথায় ঘিলু কিছু কম আছে। হাবাগোবা নয়, কিন্তু আবার দূর্দান্তও নয়। এভারেজের থেকে একটু নিচে। জগতের অনেক কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকে। যা কিছু আবদার, আহ্লাদ সব ঐ মায়ের কাছেই।
- তোর যে গিফট দেবার মুরোদ নেই সেটা আমি জানি। অন্যদিকে তাঁকিয়ে বলে সে।
আরিফ হাসে। সারাদিনে এটাই তার প্রথম হাসিমুখ দেখল নিম্মি।
- আজকে তাহলে তোর জন্মদিন না?
- না, আজকে কিছুই না। আমার হঠাৎ রান্না করতে ইচ্ছে হচ্ছিল তাই রান্না করেছি।
- তোর জন্য পাত্র দেখছে?
- তুই একটা হাবলুই রয়ে যাবি। না, কেউ আমার জন্য পাত্র দেখছে না।
- তবে রান্না শিখছিস কেন? এত ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে অবশ্য বিয়ের পরে জামাইকে রান্না করে খাওয়াবে ভাবতেই কেমন লাগছে! তোর জামাই হবে বড়লোক। দুই-তিনটা কাজের মেয়ে রাখবে রান্নাবান্নার জন্য। তুই শুধু সারাদিন পড়বি আর পড়বি।
- আমি সারাদিন পড়ি?
- সেতো আমি জানি না। আমিতো সারাদিন বাসায় থাকি না। তবে বেশিরভাগ সময়েই তুই রাত জেগে পড়িস।
- আরেকবার অনুমান কর, দেখি তোর বুদ্ধি কেমন!
- তোর স্কলারশিপটা হয়ে গেছে।
আরিফ হাসে, নিম্মি কিছু বলে না। মাঝেমধ্যে তার ভাই এত অদ্ভুত ভাবে ঠিক ঠিক কথা বলে দেয় যে সে অবাক হয়। তাকে সক্রেটিসের মত পন্ডিত মনে হয়।
- কবে যাবি?
- ছয় মাসের মধ্যে। ফুল ফান্ডেড, আমার কোন টাকা খরচ করতে হবে না। থাকা-খাওয়ার জন্য ডর্ম আর টাকাও দেবে।
- ও...। আরিফ আর কিছু বলে না। একটু চুপ হয়ে যায়।
- বাবাকে জানিয়েছিস?
- হুম, বলেছি তাকেই সবার আগে জানিয়েছি। খুব খুশি হয়েছে। আমাকে এখন আর মা-ও আটকাতে পারবে না। নিম্মির মুখে দিগ্বিজয়ীর হাসি।
আরিফ কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়। "মিথ্যে বলেছিস? আমিতো আগে থেকে জানতাম তুই অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছিস পিএইচডি করতে যাবার জন্য।"
- বলেছি তো কি হয়েছে? মানুষকে খুশি করার জন্য একটা দুটো মিথ্যে বললে পাপ হয় না।
- হুম... তুই ও চলে যাবি। আরিফ অস্ফুটে বলে। নিম্মি কোন জবাব দেয় না। এঁটো প্লেট নিয়ে চলে আসে। দুই কাপ চা বানিয়ে ফেরত আসে আবার।
- নে, চা খা। ভাই-বোন মিলে একটু গল্প করি।
- আমিতো খাবার পরে চা খাই না, বাবা খায়।
- আজকে না হয় আমার সাথে খেলি একটু।
চায়ে চুমুক দিয়ে আরিফের মুখ কুঁচকে যায়।
- তোর চা জঘন্য।
- তাও খা।
- হুম...।
- খালি হুম হুম...। কিছু বললেই হুম। তোর কি এটা বাদে কিছু বলার নাই?
- সবাইকে বলতে হবে কেন?
- সবাই আর তুই এক হলি? আমি তোর ছোট বোন। তুই কোথায় আমাকে উপদেশ দিবি, গিফট দিবি, সেখানে আমি তোকে খাওয়াচ্ছি, গল্প করতে আসছি, উল্টো উপদেশ দিচ্ছি।
- আমি তো বোকা মানুষ। দেখিস না তুই কেমন ধাঁই ধাঁই করে পাশ করে বিদেশ চলে যাচ্ছিস। আর আমি এমনই অকর্মা যে চার বছরে একটা চাকরি জোগাড় করতে পারছি না।
- কে বলেছে তুই বোকা? তুই একটা ভালো মানুষ। সহজ-সরল আর বোকার মধ্যে পার্থক্য আছে। তুই হচ্ছিস নিপাট ভদ্রলোক।
- হুম।
- হুম না। শোন তুই একটা বিয়ে করে ফেল।
- আমাকে কে বিয়ে করবে? নিজেই চলতে পারি না।
- আমার একটা বড়লোক বান্ধবী আছে। তুই রাজি থাকলে পরিচয় করিয়ে দেব।
আরিফ কিছু বলে না। নিষ্পাপ একটা হাসি দেয়।
- হাসিস না। আমি কিন্তু সিরিয়াস! বড়লোক দেখে কাউকে বিয়ে করবি। তোকে চাকরি বাকরি করতে হবে না। শশুরের টাকায় পায়ের উপর পা তুলে বসে খাবি।
- মধ্যবিত্ত চিনিস?
- চিনব না কেন?
- আমি হচ্ছি বুদ্ধির দিক থেকে সেরকম একটা মধ্যবিত্ত মানুষ। এদের সারাজীবন বেঁচে থাকার চিন্তা করতে করতেই শেষ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে যাই। সাহস কম বলে যেতে পারি না। বাইরে খাবার জন্য টাকাও নাই আমার কাছে।
নিম্মি তার ভাইয়ের চেহারার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাঁকায়। এত বোকা কিভাবে হয় একটা মানুষ? এত মানুষ এত কিছু করে ফেলে। অথচ তার ভাই কিছুই করতে পারছে না।
- চেষ্টা করতে থাক একদিন ঠিকই হয়ে যাবে।
- হুম...হবে হয়ত।
- তুই থাক তোর হুম নিয়ে...। আমি গেলাম। সকালে ক্লাস আছে।
------- 🕒-------
আরিফ মোহাম্মদপুর থানার টহল পুলিশ এর কাছে গ্রেফতার হল একদিন রাত সাড়ে এগারোটার দিকে। কোমরে দড়ি বেঁধে যখন তাকে থানার গাড়িতে তোলা হচ্ছে সে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আর নিজেকে নির্দোষ দাবি করছে। কিন্তু পুলিশ কোন কথা শুনছে না। টেনে তাকে তোলা হল গাড়িতে।
থানা থেকে রাত একটার সময় নিম্মির কাছে সে ফোন দিল, তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্য। নিম্মি তখন মাত্র একটা দূর্দান্ত থ্রিলার পড়তে শুরু করেছে। রাতে ঘুম না আসলে সে থ্রিলার বই পড়ে। এই সময় আরিফের ফোন তাকে হতবাক করে দিল। সে ভেবেছে আরিফ যথারীতি বাসায় এসে নিজের রুমে ঢুকে পড়েছে।
বাবাকে বলা যাবে না, মাকে বললে সেটা বাবার কানে যাবেই। এত রাতে সে একা একা থানায় কিভাবে যাবে সেটাও ভেবে পাচ্ছে না। হুট করে তার মনে পড়ল ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাই আছে রাজনীতি করতেন এখন কোন একটা টিভি চ্যানেলে সাংবাদিক, তাকে ফোন দেয়া যেতে পারে। থানার কাউকে হয়ত তিনি চিনবেন। অনেকদিন তার সাথে দেখা হয়না। এত রাতে ফোন দিলে আবার কি ভাবেন কে জানে?
একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে উত্তেজিত গলায় একজন ফোন ধরলেন। কারো সাথে তর্ক করছেন তিনি।
- হ্যালো, রিয়াদ ভাই, আমি নিম্মি বলছিলাম। আপনার ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র।
- নিম্মি... চেনা চেনা লাগছে। আপনি কততম ব্যাচ?
- ভাইয়া আমি, ৩৭ ব্যাচের নিম্মি। ওইযে আমাদের একটা গ্রুপ ছিল সবসময় কনসার্টের সময় ফ্রি খাবার চাইতাম।
- ওহ... মনে পড়েছে। তোমরা পাঁচ বান্ধবী সাররাক্ষন ক্যাঁচর ম্যাচর করে বেড়াতা।
- মোটেও না ভাইয়া। মেয়েরা ওইভাবেই কথা বলে।
- আচ্ছা যাই হোক। তা এত রাতে কি মনে করে? রিয়াদ সহাস্যে বলল।
- একটা দরকারে ফোন করেছি ভাইয়া। কাকে ফোন করব উপায় পাচ্ছি না।
- সে করতেই পারো। পুলিশ আর সাংবাদিককে কেউ রাত বিরেতে প্রেম করতে ফোন করে না।
নিম্মি একটা ঢোক গিলে বলল, "পুলিশের ঝামেলাই ভাইয়া। যদি একটা বুদ্ধি দিতে পারেন।" এরপর হড়বড় করে নিম্মি কি বলল সে নিজেও জানে না। তবে তার খুব কান্না পাচ্ছিল।
রিয়াদ সব কথা মন দিয়ে শুনল। নিম্মির কান্নাকাটি শেষ হলে সে শুধু বলল, "আমি দেখছি কি করা যায়। তোমার বাসা থেকে বের হবার দরকার নাই।"
রাত দুটোর দিকে রিয়াদ আরিফকে মোটরসাইকেলে করে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল। থানায় কিভাবে ম্যানেজ করেছে কে জানে? নিম্মি দরজয়ার সামনে ওঁত পেতে ছিল। বাবা-মা জানে অনেক রাতে আরিফ ফিরলে নিম্মিই দরজা খুলে দেয়। আরিফকে তাই এত রাতে কোন জেরার মুখে পড়তে হল না। রিয়াদ ভাই দাঁড়ায়নি। ধন্যবাদটুকু নিয়েই চলে গেছেন।
- কিরে তোকে মেরেছে? রুমে ঢুকেই নিম্মির প্রশ্ন।
- মারবে কেন? আমি কি চোর ডাকাত?
- তাহলে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল কেন তোকে? নিম্মি চাপা গলায় বলে।
- কারন আমি বোকা। বোকা মানুষদের পুলিশও দেখতে পারে না। আরিফের গলায় হতাশা। পানির বোতল খুলে সে ঢক ঢক করে পানি খেল।
- তুই কি করেছিস?
- শুনতে চাস?
- হুম...। নিম্মির এতক্ষন জমে থাকা ভয় ধীরে ধীরে রাগে রুপান্তরিত হচ্ছে।
আরিফ কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বিছানায় বসল। বোনের দিকে একনজর তাঁকিয়ে যা বলল সেটা অনেকটা এরকম।
টিউশনি শেষে বাসায় ফিরছিল হেঁটে হেঁটে। টং এর দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে ধরিয়ে টানতে টানতে ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছিল। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে তাকে ডাকে একটু দূরে গেলেই। কি সমাচার জানতে চাইলেই মেয়েটা তার কাছে লাইটার চায়। আরিফ কিছুটা অবাক হয়ে তাকে লাইটার নাই বলাতে মেয়েটা নাকি হাসাহাসি শুরু করে। হাসছে কেন জানতে চাইলে মেয়েটা বলে, তাহলে হাতের সিগারেট তাকে দিয়ে দিতে। বোকা আরিফ ফাঁদ টের পায়নি। হাতের সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছে। এইসময় কোথা থেকে যেন দুই যুবক আবির্ভুত হয়। তারা আরিফের কাছে এসেই টাকা পয়সা দাবি করে। আরিফ দিতে না চাইলে শুরু হয় ধ্বস্তাধস্তি। একজন ছুরি বের করে আরিফকে দেখায়। ঠিক এই সময় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটা টহল দল গাড়ি নিয়ে এসে থামে। বদমাশগুলো পালিয়ে গেলেও আরিফ আর মেয়েটাকে পুলিশ তুলে নিয়ে আসে থামায়।
- তারপর?
- তারপর আর কি? আমি যতই বলি মেয়েটাকে আমি চিনি না, পুলিশ কি আমার কথা শুনেছে? তার উপর এই মেয়ে দাবি করছে আমি নাকি তার বয়ফ্রেন্ড। এখন অবশ্য থানার হাজতে আছে। তোর রিয়াদ ভাই গিয়ে আমার পরিচয় ভ্যারিফাই করে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
- পুলিশ তাহলে তোকে মারেনি?
- আরে মারবে কেন? তুই বারবার এই কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?
- এমনি...। পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে গেলেই প্রথমে মাইর দেয়। নিম্মি এতক্ষনে পুরো ঘটনা শুনে কিছুটা স্বস্তি পায়। গত এক ঘন্টায় তার যে ভীষন পরিমান ভয় হচ্ছিল। বাবা যদি জেগে থাকত এতক্ষনে তার ভাইকে দশবার ত্যাজ্যপুত্র করে দিত। ভাগ্যিস বাবা-মা দুজনেই ঘুমিয়ে আছে।
- তুই যে ভীষন বোকা, এটা জানিস?
- জানি...। আরিফ মিনমিন করে বলে। নিম্মি না থাকলে আজকে রাতে হয়ত থানাতেই থাকতে হত। কে জানে পরেরদিন হয়ত কোর্টে চালান করে দিত।
- কিছু খেয়েছিস?
- না... খিদে নেই। এখন আর খাব না।
- তুই বস। আমি তোর জন্য ডিম ভেজে ভাত নিয়ে আসছি। মনে হয় ডালও আছে। ডাইনিং রুমে যাবি না। বাবা জেগে গেলে কৈফিয়ত দিতে দিতে জান বের হয়ে যাবে।
আরিফ কিছু বলল না, স্থানুর মত একজায়গায় বসে রইল। তার এই জীবনে সে এইরকম গ্যাড়াকলে পড়েনি কোনদিন।
------- 🕒-------
নিম্মি দেশ ছাড়ল ডিসেম্বরের দশ তারিখে। তার মায়ের প্রবল আপত্তি ছিল একা মেয়ে কেন এতদুর যাবে? যদিও আরিফ সাহেবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সে আপত্তি টেকেনি। তার এককথা, ছেলেরা যদি বাইরে যেতে পারে একা, তবে একটা মেয়ে কেন পারবে না? আর নিম্মির মত ভাল স্টুডেন্টরা না গেলে কারা যাবে, আরিফের মত বোকারা?
আরিফ এইসব কথাবার্তায় জড়ায়নি। তার মতামত আসলে কেউ নেয় না। বেকার মানুষ হচ্ছে পাপোষের মত। টিকে থাকলেই কি, আর চলে গেলেই কি? এয়ারপোর্টে আরিফ কোন কান্নাকাটি করল না। তবে বের হয়ে তার ভীষন কান্না পেল। মনে হচ্ছে এই শহরে তার আপন বলতে কেউ থাকল না। সে মনে মনে বুঝতে পারছে নিম্মির উপর সে কতটা নির্ভর করত। আরিফ সাহেব আর রাহেলা হাউমাউ করে এমন কান্না করলেন যেন মেয়ে আর ফিরে আসবে না কোনদিন।
দিন চলে যায়। আরিফ এখন বাসায় তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করে। মা তার জন্য রাত জেগে বসে থাকতে পারবেন না, যদিও বাবা বকাবকি করেনন না আগের মত। টিউশনি ছেড়ে আরিফ এখন মাঝেমাঝেই বাবার সাথে ফার্মেসিতে বসে। শুধু রাতে একটা টিউশনি করে মোহাম্মদপুরে। তার এই ছাত্রীর পরীক্ষা সামনে। পরীক্ষা শেষ হলে এটাও ছেড়ে দেবে। একটা ব্যাংক জবের অফার পেয়েছে। মাস তিনেক ট্রেইনিং পর জয়েন করতে হবে।
টিউশনি শেষে সেদিন রাতে সে ফুটপাত ধরে হেঁটে আসছে। একটু দূরেই সেই মেয়েটাকে দেখতে পেল, যার জন্য তাকে থানায় যেতে হয়েছিল একদিন। আরিফ অবশ্য এবার আর ভয় পেল না। গুটি গুটি পায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটার। বেশ সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। যে কেউ মনে করবে দাওয়াতে গিয়েছিল এখন রিকশা বা সিএনজি পাচ্ছে না।
- সিগারেট খাবেন?
মেয়েটা চমকে গেল। আরিফকে দাঁড়াতে দেখে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে টিপাটিপি শুরু করে দিল।
- আমাকে চিনতে পারেন নি?
- আপনি কে? তার গলার স্বরে সন্দেহ আর ভয়।
- মনে নাই? ঐ যে মাস ছয়েক আগে একদিন থানায় ধরে নিয়ে গেল আমাকে আপনার জন্য। আপনি বলেছিলেন আপনি আমার গার্লফ্রেন্ড।
- কি যা তা বলছেন? মেয়েটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখতে পাচ্ছে আরিফ। তার কাছে ব্যপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে এখন।
- আপনার বন্ধুরা কই? আশেপাশেই আছে?
- দ্যাখেন আপনি কিন্তু ম্যালা কথা বলতেসেন। আমি কিন্তু চিৎকার করে লোকজন ডাকব। বিপদে পড়বেন... ভালো চাইলে এখান থেকে চলে যান।
আরিফ আশেপাশে তাঁকাল। রাত বেশ হয়েছে, লোকজনের আনাগোনা খুব কম। একজন দুজন পাশ দিয়ে গেলেও থামছে না। একবার এদিকে তাঁকিয়েই আবার চলে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের মানুষ কেউ কারো ব্যপারে নাক গলাতে চায় না। কে চায় খামোখা বিপদে জড়াতে?
- সেদিন লাইটার চেয়েছিলেন, ছিল না। আজকে নিয়ে এসেছি। আরিফ পকেট থেকে লাইটার বের করে মেয়েটার সামনে ধরে।
মেয়েটা এবার ভয়ের চিহ্ন লুকানোর কোন চেষ্টা করল না। বাস্তবিকই সে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। তার দুই সঙ্গী নিশ্চিত আরিফকে চিনতে পেরেই সামনে আসছে না। তারা নিশ্চয়ই ভেবেছে আরিফের আশেপাশে পুলিশ ওঁৎ পেতে আছে।
- ভাই, ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দেন।
- কি ভুল? সিগারেট খাবেন না? আরিফ স্মিত হেঁসে বলে।
- আপনি কি পুলিশ সাথে করে নিয়ে এসেছেন? ভাই আমাকে মাফ করে দেন। আমার একটা ছোট মেয়ে আছে, বাসায় আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটার গলা কাঁদোকাঁদো হয়ে গেছে।
আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এখন আর ঢাকায় সোডিয়াম লাইট দেখা যায় না। তার বদলে এলইডির রাজত্ব। এই আলোতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মেয়েটার মেকাপ গলে যাচ্ছে। অথচ দেখতে কি মায়াময় লাগছে।
- আপনার নাম কি?
- বিনতি...। ভয়ার্ত স্বরে বলে মেয়েটি। "স্যার আমাকে মাফ করে দেন।"
আরিফ লাইটারটা মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দিল।
- বিনতি, সিগারেট খেতে ইচ্ছে হলে এই লাইটার দিয়ে খাবেন। রাস্তায় কারো কাছে চাইবেন না।
মেয়েটাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আরিফ হাঁটা দিল। শহরটা কত অদ্ভুত। সবার জন্যই কেউ না কেউ অপেক্ষা করে আছে। মানুষ ঘরে ফিরবে, রাত্রে নিশ্চিন্তে প্রিয়জনকে জড়িয়ে একটা ঘুম দেবে। তৈরি হবে পরের দিনের যুদ্ধে যাবার জন্য। শুধু তার কোন উদ্দেশ্য নেই। প্রতিদিন শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।






0 Comments