পরীক্ষার সিট সামনের বেঞ্চে পড়াটা একটা মহা মুসিবতের বিষয় ছিল আমার জন্য। স্কুলে থাকতে তাই সব সময় দোয়া করতাম যেন ফাইনালে কখনও এরকম না হয়।
বিধি বাম, মাঝে মধ্যে সামনে সিট পড়ে যেত।
আলিনার ক্লাস পরীক্ষার সিট এবার সামনের বেঞ্চে পড়েছে। স্কুল থেকে বের হয়েই সে আমাকে এই দুঃখের খবর দিল।
আমি দুঃখী দুঃখী গলায় জানতে চাইলাম, তাহলে এখন কি হবে? তুমি তো পরীক্ষার সময় কারো সাথে কথা বলতে পারবে না।
আলিনা চোখ পাকিয়ে তাঁকাল। তার নির্লিপ্ত এবং তাচ্ছিল্যের এই দৃষ্টি কার কাছ থেকে পেয়েছে কে জানে?
- আমি কি পরীক্ষার সময় কথা বলি নাকি? সামনের বেঞ্চে বসলে টিচার সামনে বসে থাকে তখন ভাল লাগে না।
- আমার লাগতো না। কিন্তু মাঝে মধ্যেই সিট সামনে পড়ে যেত।
- তখন তুমি কি করতে?
- আমি বেশি করে ভালো করে পড়ে যেতাম।
আলিনা কিছু বলল না। তার বাসায় যাবার তাড়া আছে। বাসায় গেলেই কম্পিউটারে বসে গেইম খেলতে পারবে। অন্য একটা জগত তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমার উদ্ভট কথাবার্তা শোনার সময় তার নেই। যদিও তার জন্য আমার অফুরন্ত সময় বরাদ্দ করা।
আমি ছোট থাকতে পরীক্ষার ভয়ে এতটা ভীত ছিলাম না। আমি পড়তাম আমার মত করে। ক্লাস এইট পর্যন্ত আমার কোন টিচারও ছিলো না। টিচার রাখার জন্য আমার বাবার সামর্থ্য ছিলনা সে সময়। আমার মেয়েটা তার মাকে টিচার হিসেবে পেয়েছে। চাইলে আমিও তাকে পড়াতে পারি। যদিও অদ্ভুত কারনে সে আমার কাছে পড়তে চায় না। অথচ যতগুলো টিউশনি আমি করিয়েছি, সব কজন ছাত্র-ছাত্রী বলেছে আমি ভালো পড়াই। শুধু নিজের মেয়েটাই আমাকে চিনল না। জোর করে পড়াশোনা হয় না। যেটা হয় সেটার নাম টর্চার।
আলিনা অবশ্য পড়াশোনার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। সে নিয়ম করে একগাদা বই ক্লাসে নিয়ে যায়। তার ব্যাগের ওজন দেখে আমার মাঝে মধ্যে ভয় হয় এই শুকনা-পটকা দেহ নিয়ে সে যে কোন সময় সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাবে।
পরীক্ষায় ভাল করলে সে আমার কাছ থেকে একটা গিফট পায়। সেটা তার পছন্দের যে কোন কিছু হতে পারে। এখনও পর্যন্ত সে অতি দামী কোন কিছু চায়নি।
পরীক্ষায় খারাপ করলেও অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। এই পড়াশোনা আর শেখার পদ্ধতি মানুষের তৈরি করা। সেখানে যথেষ্ট ভুল আছে। আমি বাচ্চাকে স্কুলে প্রতিযোগিতা করতে পাঠাইনি। তার শৈশবের স্মৃতি তৈরি আর সামাজিকতা শিখতে পাঠিয়েছি। তার কিছু বন্ধু হোক, যাদের সে আজীবন মনে রাখবে, তার একটা পরিচিত এলাকা হোক, স্কুল মাঠে বৃষ্টি-কাদায় ভেজার সুখ-স্মৃতি থাকুক।
আমাকে লিখতে দেখে হয়ত মেয়েটারও লেখার প্রতি একধরনের আগ্রহ হয়েছে। একদিন স্কুল শেষে আমাকে এসে জিজ্ঞেস করছে, বাবা তুমি কি লেখক? আমি চমকে গিয়ে বললাম, হ্যাঁ, তা বলতে পারো। হঠাত এ প্রশ্ন কেন করছো?
- আমাদের মিস জানতে চেয়েছিল। আমি বলেছি তুমি লেখক।
- ঠিক আছে।
- তুমি কি লেখ বাবা?
- অনেক কিছু লিখি, গল্প লিখি, কবিতা লিখি, আবার পেটের দায়ে কম্পিউটারে কোডও লিখি। মাঝে মধ্যে পত্রিকায় লিখি।
আমরা সবাই আসলে লেখক। কেউ জীবনের কথা লেখে আর কেউ জীবনের জন্য লেখে। লেখালেখি করতে পারে বলেই মানুষের সভ্যতা টিকে আছে।
আলিনা এখন ছোট বড় নানা সাইজের খাতায় গল্প আর কবিতা লিখছে। লেখা শেষ হলেই আমাকে বা তার মাকে সেগুল পড়তে দেয়। তার কবিতায় বিষন্নতা মানে পড়াশোনার চাপ আর বেড়ালের কথা।
একটা বড় গল্প লিখে নিয়ে আসল সেদিন আমার জন্য। আমি রাতে পড়ব বলে রেখে দিলাম। গল্পটা তার অতীত আর সে যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে এরকম একটা সময় নিয়ে লেখা। মানে ফ্ল্যাশব্যাক আছে আরকি। ঘটনার পরম্পরা মেলানো কঠিন, তবে আমি শিওর ওর এই বয়সে আমি এত কল্পনা করে লিখতে পারতাম না। সেখানে একটা পরীর কথা আছে। পরী তাকে সাপের কামড় থেকে বাঁচায়। এই ঘটনা আবার ঘটে তার স্কুলে। নিশ্চিত তার স্কুলে একটা গুজব আছে, মাঠের কোণায় সাপ আছে (থাকতেও পারে)। সেখানে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে মা তাকে পড়াশোনার জন্য চাপ দিচ্ছে সে কথা আছে, বান্ধবীদের কথা আছে, কিন্তু বাবার কথা নেই। অত্যন্ত সচেতনভাবে সে গল্পের চরিত্র থেকে "বাবা" নামক ক্যারেক্টারকে দূরে রেখেছে।
আমার খুব মন খারাপ হলো। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি তার সাথে থাকি। আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করি। যদিও আমি বুঝতে দেই না কিভাবে তাকে নিরাপধ রাখার জন্য আমি সদা সতর্ক থাকি। মায়ের ভূমিকা অনেক, কিন্তু তাই বলে বাবা একেবারে অনুপস্থিত একটা গল্পে? আমি টানা একদিন ভাবলাম তার এই সাইকোলজি নিয়ে। কোন কারনে কি তার মনে হয়েছে আমি একটা নিরানন্দ চরিত্র? একে গল্পে রাখলে গল্পের মজা নষ্ট হবে?
রেসিজম আমার মেয়েকে শেখাইনি। ধর্মের ভেদাভেদ যতদূর সম্ভব ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করেছি আমি। ধর্মের মূল কথা এখনও সে বুঝতে পারবে না জানি, তবু আমাকে দেখে কিছুটা হলেও শিখবে যে, "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান"। যদিও আমাদের স্কুলের ধর্ম পুস্তকগুলো মানুষকে বড় না করে নির্দিষ্ট বিশ্বাস বা জাতিকে বড় করে দেখায়। বাচ্চাদের এইসব শিখিয়ে আমরা চাই তারা মহানুভব হয়ে গড়ে উঠুক! হতভাগা জাতি আমরা।
স্কুলে একবার একজন অভিভাবক আমাকে মন খারাপ করে বলেছিলেন, কেউ একজন তার বাচ্চাকে বলেছে, সে হিন্দু তাই তার সাথে মিশবে না। আবার আমার নিজের বিল্ডিং এর একজন সরকারি কর্মকর্তা বিল্ডিং এর অন্যান্য হিন্দুদের ব্যাপারে আমার কাছে বিশোদগার করেছিলেন। এই একই চিত্র নিশ্চিত পৃথিবীর অন্যকোনখানে মুসলিমদের বেলায়, খৃষ্টানদের বেলাতেও কেউ বলে। কি অদ্ভুত এই তারার সন্তানেরা। একই তারার নিচে বড় হয়ে তারা ভাবে শুধু ভিন্ন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তারা অন্যদের উপর প্রভুত্ব করার অধিকার রাখে!
যাই হোক, এত কথা বলার কারন হল, আলিনার গল্পের নায়িকার নাম কৃষ্ণচূড়া। এই নামটা সে কেন বেছে নিলো আমি সেটা জানি না। যদি কেউ একজন তাকে শিখিয়ে দিত, এটা একটা হিঁদুয়ানি নাম, তবে সে নিশ্চিত এই কাজ করত না।
আমরা স্কুলের পরীক্ষাকে অনেক গুরুত্ব দেই। কিন্তু মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার পরীক্ষায় শতকরা আশি ভাগই ফেল্টুস ছাত্র।






0 Comments