অন্যান্য

আমার আমি-১: উচ্চতর গনিত

ভুলে গেছি, অনেক কিছু ভুলে গেছি। প্রকৃতির নিয়মে আমাদের মস্তিষ্ক কম দরকারী তথ্য মুছে ফেলে বা আড়াল করে ফেলে। কিন্তু অদ্ভুত এক কারনে অহেতুক এবং অর্থহীন কিছু তথ্য আজীবন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।

স্কুলের কথা লিখব বলে শুরু করেছিলাম। ভাসা ভাসা টুকরো টুকরো ইতিহাস, সব কিছু মনে রাখা অসম্ভব। যখন ক্লাস নাইন-টেন এ পড়ি আমাদের একটা সাবজেক্ট ছিল উচ্চতর গনিত। গনিত কেন উচ্চতর হবে সেটাই আমার মাথায় তখন ঢুকত না, গনিত হবে গনিতের মত।

আমাদের সময় ইউটিউব ছিলনা যে গনিতের সূত্র এবং সমাধান গুলো মজা করে শেখা যাবে। আমাদের শিক্ষকেরাও খুব বেশি সচেতন ছিলেন না শেষ বেঞ্ছের ছাত্রদের প্রতি। পড়াশোনার যে মজা সেটা না পেয়ে তাই যথারীতি আমি উচ্চতর গনিতের ততোধিক উচ্চতর ভীতিতে সন্ত্রস্ত ছিলাম সেসময়। ফলাফল, ঐচ্ছিক এই বিষয়ে প্রথমবার ৫ পেয়েছিলাম ১০০ তে।

যতদূর মনে পড়ে আমাদের উচ্চতর গনিতের ক্লাস নিতেন তখন আফরোজা ম্যাডাম। তিনি শুকনো পাতলা ধরনের খিটখিটে মহিলা ছিলেন। আমাকে ডেকে তিনি একবার বলেছিলেন আমি উচ্চতর গনিত না নিয়ে কেন অন্য বিষয় নেইনি। যদিও আমার জানামতে বুয়েট স্কুলে সে সুযোগ আমার ছিল না। সেটা তারও জানার কথা। আমি চাইলেই ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে গার্হস্ত্য অর্থনীতি নিতে পারতাম না।

মূল কথা আমার সমস্যা যে গনিত বুঝতে না পারা নিয়ে সেটার সমাধান না করে তিনি আমাকে ভৎর্সনা করাতেই সমাধান খুঁজেছিলেন। আজও যখন আমার এই কথা মনে পড়ে অদ্ভুত কারনে আমার মনে হয় স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও আমরা বুলিং এর শিকার হতাম!

এসএসসি বোর্ড এক্সামের ঠিক আগের দিন আমি সেই উচ্চতর গনিতের বই কুটি কুটি করে ছিড়ে ফেলি। কেন করেছিলাম আজও জানি না। তারপর আজিমপুর এর এক লাইব্রেরী থেকে একটা নতুন বই আর সমাধান কিনে আনি। উচ্চতর গনিতে অংক ছিল অনেক অল্প। আমি সমাধান বই দেখে সেই অংক সারাদিন সারারাত করি, মানে একরকম মুখস্ত করে ফেলি আরকি। বুঝতে না পারার অক্ষমতা আমি মুখস্ত করার ক্ষমতা দিয়ে পূরণ করে দিয়েছিলাম

ফলাফল, উচ্চতর গনিতে আমি এ+ পাই। যদিও সেখানে কৃতিত্ব মুখস্ত বিদ্যার। যথারীতি মনের ক্ষোভ ঝাড়ার জন্য রেজাল্টের পর স্কুলে গিয়ে ম্যাডামকে বলেছিলাম ম্যাডাম এ+ পেয়েছি কিন্তু…!

সাধারন গনিতের ভয় আমার কাটিয়ে দিয়েছিলেন সিদ্দিক স্যার, তার কাছে আজও আমি কৃতজ্ঞ। তার বাসায় প্রাইভেট পড়তে যেতাম আমরা ব্যাচ করে। হারামি সব পোলাপান একসাথে পড়তে যেতাম, সে এক আনন্দের সময় ছিল। স্যার আমাদের এত এত প্র্যাক্টিস করাতেন আর পরীক্ষা নিতেন যে অংকে কোনভাবেই খারাপ করা সম্ভব ছিল না। অদ্ভুত কারনে তিনি মনে হয় আমাকে কিছুটা পছন্দও করতেন। তার হাতে মার খুব কম খেয়েছি 🙂 মনে পড়ে না। অথচ স্কুলে তিনি আমাদের কৃষি শিক্ষার ক্লাস নিতেন। সেই কৃষি শিক্ষা আদতেও আমাদের কোন কাজে লাগে নি। আমার শুধু ইপিল ইপিল আর ব্লাক বেঙ্গল ছাগলের কথা মনে আছে। আর জেনেছিলাম মুরগীর রানীক্ষেত রোগ হয় ঃ)।

গনিতের মজা আমি পেয়েছি কলেজে উঠে। তখন সিটি কলেজে পড়ি, বিজ্ঞান বিভাগ। আরো কিছু বন্ধুদের সাথে মিলে এহসান স্যারের কোচিং এ যেতাম। তার কোচিংটা ছিল সাইন্সল্যাবের ঠিক মোড়ে, যেখানে বাদ্যাযন্ত্রের দোকান গুলো আছে সেখানে। এই ভদ্রলোক আমাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে সূত্র এসেছে, কেন এসেছে কোন যুক্তিতে।

তার সেই যুক্তির ধার আমার মাথায় ঢুকে যায়। এরপর আমি যখনই কোথাও টিউশনি করেছি আমার স্টুডেন্ট সবসময় আমাকে বলত স্যার তুমি গনিত ভালো বোঝাও। আমি হাসতাম কারন ততদিনে আমি জেনে গেছি গনিত যুক্তির কথা বলে। যে যুক্তি আমি স্কুলে থাকতে শিখতে পারিনি এক অখ্যাত কোচিং শিক্ষক আমাকে সেই গনিতের যুক্তি শিখিয়েছিলেন।

আজও আমি এহসান স্যারকে খুঁজে বেড়াই, তিনি তার আগের জায়গায় নেই। ব্যাস্ত জীবনে একবার হলেও স্যারের সাথে এককাপ চা খেয়ে তাকে বলতে ইচ্ছে করে, আপনার মত মানুষ আর শিক্ষক আমাদের স্কুলে স্কুলে দরকার।

উচ্চতর গনিত – সে আজো আমার মনে দাগ কেটে আছে। কেন এটা দরকার, কেন করেছিলাম তার কিছুই আমার মনে নেই। এখন সময় কাটে কোড এডিটর স্ক্রিনে আর কীবোর্ডের বোতাম টিপে। কোডিং যুক্তির কথা বলে। আমি শুধু উচ্চতর গনিতের যুক্তি বুঝতে পারিনি।

মন্তব্য