||এক||

ছোট্ট একটা মেয়ে পুতুল আর বাঘ নিয়ে খেলা হচ্ছে। সাথে তার ডল হাউসটাও আছে।

ঃ বাবা… তুমি এটা নিয়ে খেল আর আমি মা হব… আমি বলব তুমি দুষ্টামি কোরো না… ওকে বাবা?

আমি কিছুক্ষন হাতের ছোট্ট পুতুলটা নাড়াচাড়া করলাম। কিন্তু তাতে আলিনার মন ভরে না।

ঃ তুমি ঠিক করে খেলো বাবা।
ঃ পিউ……। হুইইইইসসস…।
ঃ কি হচ্ছে বাবা?
ঃ ও… সুপারগার্ল … আকাশে উড়ে যাচ্ছে।

আলিনা কপট হাসিতে ফেটে পড়ে, তুমি কিছু জানো না বাবা, এটা বাংলাদেশ… এখানে সুপারগার্ল হয় না।

আমি আর আমার বউ একজন আরেকজনের দিকে তাঁকিয়ে হেসে দিলাম। আলিনাও জানে… সুপারগার্লরা বাংলাদেশে হয় না।

আমার হাসির পেছনে একট চাপা দুঃখ ছিল। এই দেশে আসলে অনেক কিছুই হয় আর অনেক কিছুই হয়না। যা হওয়া উচিত নয় তাই হয়। এটা বাংলাদেশ।

আলিনা অধ্যায় - ৮ 1
সুপারগার্লের মত আকাশে উড়তে না পারলেও – আকাশ পর্যবেক্ষনে কোন বাধা নেই।

।। দুই ।।

সকালবেলা নাস্তা খাওয়াতে নিলে বাবা-মেয়ের একটা ছোটখাট নাটক হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে তার নাস্তা খাবার বদলে খেলাধুলা শুরু করাটাই মুখ্য থাকে আর আমি চাই সে নাস্তা শেষ করুক আগে। যদিও সে নাস্তা খেতে বসবে, কিন্তু তার আগে একটু অনীহা প্রকাশ করাটাকে যেন রীতি হিসেবে নিয়েছে।

তো… গতকাল তাকে নাস্তা খেতে বলার পর সুড়সুড় করে ডাইনিং টেবিলে চলে গেল। এরপর টেবিলে উঠে চিরুনি আর একটা বড়সড় ললিপপের ডান্ডা তুলে নিয়ে বললঃ

ঃ এগুলো, লুকাতে হবে। নাহলে পড়ার সময় মা আমাকে এগুলো দিয়ে মাইর দেবে।
ঃ মা তোমাকে মারে?
ঃ হ্যাঁ… মারে তো। ঠুস…ঠুস করে মারে। এগুলো খাটের নিচে নিয়ে লুকাতে হবে, তাহলে মা আর খুঁজে পাবে না। আমাকে মারতেও পারবে না। তাই না বাবা…?
ঃ… ঠিক… কিন্তু চিরুনি লুকানোর দরকার নাই… এটা জায়গামত নিয়ে রাখ…।

বাধ্য মেয়ের মত সে অস্ত্রশস্ত্র লুকাচ্ছে।

ঃ কিন্তু মা তো তোমাকে হাত দিয়েও মারতে পারে।
ঃ হাত দিয়ে মারলে ভয় লাগে না। আলিনার সরল জবাব।

আমি কিছুটা ম্লান স্বরে বললাম, “তাই তো”।

আমরা আমাদের ভয়গুলো লুকাতে চাই। প্রতিনিয়ত লুকাতে চাই। সেটা প্রিয়জনের কাছ থেকে হোক আর বন্ধুর কাছ থেকেই হোক। আমরা ছোটবেলা থেকেই ভয় লুকিয়ে রাখার অভ্যাস করি। আমার ছোট মেয়েটা আজকে আবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

রাষ্ট্র তার করোনা ভীতি লুকাতে চাইছে। কারন সত্যটা মাথা পেতে নেবার মত শিরদাঁড়া আমাদের নেই।

এমনিতেই করোনার মহামারী কবে থামবে বলা যাচ্ছে না। স্কুল বন্ধ, বাসায় বসে যেটুকু শেখার দরকার তার সবটাই মার কাছে শেখা হচ্ছে। তারপরেও পড়াশোনার প্রতি কেন যে ছোট থেকেই একটা ভয় চলে আসে বাচ্চাদের! আমদের শেখানোতে কি একটা বড় ধরনের ভুল হয়?

আলিনা অধ্যায় - ৮ 2
বৃষ্টির পানিতে ভিজতে হবে আর মাকে গিয়ে বলতে হবে বাবা আমাকে জোর করে বলেছে তুমি পানিতে খেল… খেল…

।। তিন ।।

মহামারী নিয়ে কিছু লিখব না ঠিক করেছিলাম। কিন্তু ঘুরে ফিরে সেইদিকেই মন চলে যায় বারবার। করোনা এসে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার ন্যাংটামো যেমন দেখিয়েছে, তেমনি দেখিয়েছে অমানুষেরা সব মানুষের বেশেই থাকে। নকল ঔষধ, পরীক্ষবিহীন করোনা টেস্ট রেজাল্ট, স্বাস্থ্য উপকরন আমদানিতে সীমাহীন দূর্নীতি সব চলছে একই সময়ে। আমাদের মানুষ হবার কথা থাকলেও আমরা মানুষ হইনি।

করোনা এসে শুধু অমানুষগুলোর মুখোশ সবার সামনে খুলে দিয়ে গেছে। যে যত উপরের পদে আছে তার দূর্নীতির পরিমান তত বেশি। হতভাগা, আধপেট খাওয়া জনগন যারা এসির বাতাসে বসে শহরের রাস্তা দেখতে পারে না, ককটেল আর পার্টি ড্রেস কোড জানে না, তারা শুধু উপরওয়ালার কাছে বিচার দেয়। সেই উপরওয়ালাকে থোড়াই কেয়ার করে অর্থের উপাস্যকারীরা।

।। চার।।

বাইরে যেতে না পেরে, ঘুরতে না পেরে আলিনা হাঁপিয়ে ওঠে। চার দেয়ালের মাঝে করার মত জিনিস খুব অল্প। আর বাচ্চাদের মস্তিষ্ক সব সময় খুঁজে বেড়ায় নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায়।

ইদানিং সে আমার মত এস্ট্রোনমির ভিডিও গুলো দেখা শুরু করেছে। সোলার সিস্টেম এখনো পুরোপুরি না বুঝলেও গ্রহ এবং তারা সে বোঝে। পৃথিবীর থেকে বড় যে বৃহস্পতি গ্রহ সেটা সে জানে। তার শিশু মনে মারাত্বক নির্মল কিন্তু অতি প্রাচীন প্রশ্নগুলো উঠে আসে –

ঃ এই এত বড় প্লানেট কে বানিয়েছে বাবা?
ঃ একটা অনেক বড় বিগব্যাং, মানে বিস্ফোরন হয়েছিল সেখান থেকে আস্তে আস্তে সব কিছু হয়েছে।
ঃ পটকা ফোটার মত…?
ঃ অনেকটা তাই।
ঃ পটকা কে ফুটিয়েছে বাবা?

আমি ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্য বললাম, “আল্লাহ”।

ঃ আল্লাহ কি ম্যাজিক জানে? ম্যাজিক দিয়ে সব হয়ে গেছে?

আমি চাইলেই এর জটিল জবাব দিতে পারি। কিন্তু শিশুমনের সরলতাটুকু ভাঙ্গতে চাইছিলাম না। ধর্ম বিশ্বাস থেকে সে বারংবার এই প্রশ্নের উত্তর পাবে “আল্লাহ সব বানিয়েছে”। কিন্তু বিজ্ঞান তাকে অন্য জবাব দেবে। বিজ্ঞানের যে হাত পা বাধা। কার্যকারন আর প্রমান বাদে বিজ্ঞান তার বাপকেও বিশ্বাস করে না।

ঃ বলোনা বাবা… আল্লাহ কি অনেক বড়? আল্লাহকে কে বানিয়েছে তাহলে?

এই প্রশ্নেরও কোন সরল জবাব আমার কাছে নেই। আমি তাকে শুধু কিছু চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আজ দেব না। তার মা আমাকে মানা করেছে 🙂

ঃ আল্লাহকে কেউ বানায়নি। আল্লাহ আগে থেকেই ছিল। এই যে তোমার হাত-পা আছে, চোখ আছে, আল্লাহর এরকম কিছুই নেই। তুমি আশেপাশে যা কিছু দেখ, গাছ, নদী, পাখী, গ্রহ তারা … সব কিছু মিলিয়েই আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের মতন না। আমাদের মতন হবার তার দরকার নেই।

ঃ ও… ও… তার মানে ভলকানোও (Volcano) আল্লাহ বানিয়েছে?
ঃ অবশ্যই, তার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। আমরা তার অল্পই জানি।

ঃ ভলকানো থেকে লাভা বের হয়… জানো বাবা?
ঃ তাইতো… তুমি তো অনেক কিছু শিখে গেছ মা।

আলিনার এই বয়সে আমি কাদামাটি আর নারিকেল পাতা দিয়ে খেলতাম। পৃথিবীর জটিলতম অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে বোঝার সময় হয়নি তখন আমার। আমার কন্যার এই সব প্রশ্নের মূলে রয়েছে ইউটিউব নামক এক প্রচন্ড শক্তিধর ক্লাসরুম। স্কুলে সে যা শিখবে তার থেকে বেশি সে আয়ত্ব করছে প্যাসিভ লার্নিং এর মাধ্যমে। একদিন হয়ত সে যখন বইয়ের সাথে এগুলো মেলাতে পারবে তখন সৃষ্টি রহস্যের অনেক কিছুই তার বোধগম্য হবে।

বিজ্ঞান একটা পদ্ধতি মাত্র। সে অনুসন্ধান করে যায়। এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন বালাই নাই। প্রানের উৎপত্তি বা সৃষ্টি রহস্যের পদ্ধতি সে এখনও পর্যন্ত তার লব্ধ জ্ঞানে ব্যাখ্যা করার চেষ্ট করে মাত্র।

অপরদিকে স্কুল অব রিলিজিওন ইতিমধ্যেই এর উত্তর দিয়ে দিয়েছে। সকল সৃষ্টি ঈশ্বরের/গডের ইচ্ছায় হয়েছে।

বাবা তোকে এর জটিল পটভূমি ব্যাখ্যা করতে চাইনি। যখন বড় হবি তুই নিজেই বুঝে নিতি পারবি কি, কেন, কিভাবে! সে পর্যন্ত শৈশব থাকুক ফুল-পাতা আর আকাশের ঘুড়িতে বিস্মিত হয়ে।

ভালো থাকুক মানুষের সপ্তম প্রজাতি Homo Sapiens ।

আলিনা অধ্যায় - ৮ 3
প্লে-ডো দিয়ে বানানো পিতজা। আমাকে অবশ্যই বলতে হবে আলিনারটা ভালো হয়েছে। আমার ল্যাপটপের টেবিল হয়েছে তার খেলার ডাইনিং টেবিল 🙂
লেখালেখির শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। তখন বিভিন্ন দেয়ালিকা আর কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার ফেরা লেখালেখিতে। মূদ্রনে ভীষন অনীহা আমার। প্রযুক্তি সেই সুবিধা দিয়েছে আমাকে। প্রযুক্তি প্রেমিক বলে আমার লেখায় বারবার চলে আসে এই বিষয়গুলো। আমার সাহিত্য ভাবনা, ঘোরাঘুরি আর কিছু ছবি নিয়ে। একদম সাদামাটা একজন মানুষের মনের কোনে কি উঁকি দেয়?

Leave a Reply