আলিনা অধ্যায় - ৫ 1

||এক||

কন্যার মা ইলিশ মাছ ভাজছে। তার সুঘ্রান সারা ঘরে। মাছ তার পছন্দের একটা খাবার। সে অবশ্য মাছ বলে না আমাদের মত, বলে ফিশ 😆।

হাতের মোবাইল রেখে দৌড়ে রান্নাঘরে মার কাছে, আর আমার দিকে এমন একটা চেহারা করল চোখ বড় বড় করে….. আগের দিনে বাসায় মেহমান রসগোল্লা আনলে আমাদের চেহারা যেরকম হত।

ঃ মা… কি ফিশ রান্না করছ?
ঃ ইলিশ মাছ মা…. খাবে…??? কন্যার মায়ের ও আহ্লাদিত কন্ঠ। আমি পাশের রুম থেকে শুনছি।
ঃ ইলন মাস্ক খাব… ইলন মাস্ক খাব মা….। অন্তত আমার কাছে মনে হল আলিনা ইলন মাস্ক’কে খাবার কথা বলছে।

আমি নিশ্চিত হবার জন্য উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

ঃ কি খাবে তুমি?
ঃ ইলিশ মাছ…। পরিষ্কার জবাব আলিনার।

নাহ… আমিতো ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমারই শুনতে ভুল হয়েছে।

সবেধন একটাই রিয়েলটাইম আয়রনম্যান আছে, ইলন মাস্ক, তাকেও খেয়ে ফেলবে 🤣।

||দুই ||

কন্যারা কিছু দেখালে বা আপনাকে বিস্মিত করতে চাইলে চেহারায় উৎসাহের ভাব আনাটা আপনার জন্য ফরজ। আপনি অবাক না হলেও আপনাকে অবাক হতে হবে, অন্তত ভান করতে হবে অবাক হবার।

তার কার্টুনে ব্যাপক নাচা-গানা হচ্ছে। যার বেশিরভাগ নিয়ে এই বয়সে আমার আনন্দিত বা অবাক হবার কিছু নাই।

সে আমাকে ডাকল-

ঃ বাবা, বাবা দেখ –
ঃ কি…!
ঃ দেখ… দেখ… দেখ….
ঃ সর্বনাশ… কি হচ্ছে এটা… আমি অবাক হবার ভান ধরি।
ঃ সর্বনাশ মানে কি বাবা? আলিনার প্রশ্ন।
ঃ সর্বনাশ মানে সব বিনাশ… কিন্তু আমি অবাক হয়েছিতো তাই এটা বলেছি। অনেক ভাষাতেই এরকম শব্দের উড়াধুড়া প্রয়োগ হয়।

এ কথা বলেই আমি প্রমাদ গুনলাম। এখন না এটা নিয়ে আরেকটা লেকচার দিতে হয়। কিন্তু আলিনা সেদিকে গেল না।

ঃ না.. না… তখন তুমি বলবে… ওয়াও… ওএমজি…।

আক্ষরিক অর্থেই আমি এবার বললাম OMG! কন্যা কি আসলেও শর্ট হ্যান্ড প্রজন্মের মত কথা বলছে? নাকি আমার সাথে সারকাজম?

মেয়েলোক জন্মের পর থেকেই জটিল।

।। তিন।।

ভাবছেন বাপ-মেয়ে সবসময় রসিকতাই করি? ভুল…

আমরা মাঝে মাঝে গভীর জীবনবোধের আলোচনাও করি। এই যেমন ধরেন মানুষ মরে গেলে কি হয়, কোথায় যায় এইসব আরকি –

আজিমপুর কবরস্থানের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, আলিনার প্রশ্নঃ-

ঃ বাবা এখানি কি হয়? এত মানুষ কেন?
ঃ কেউ মরে গেলে এখানে এনে কবর দেয়।
ঃ কবর কি?
ঃ মরে গেলে তাকে একটা গর্ত করে এখানে এনে মাটি দিয়ে চাপা দিয়ে দেয়।
ঃ মরে গেলে তো সবাই আল্লার কাছে চলে যায়… এখানে কেন আনে?

আমি কিছুটা চুপ করে ভাবি, আত্মা এবং দেহ এই সম্পর্কে তাকে একটা লেকচার দেয়া দরকার, কিন্তু আপাতত থাকুক … বয়স মাত্র পাঁচ ছুই ছুই।

ঃ আল্লার কাছেও যায় আবার তার বডিটা এখানে নিয়ে আসে।
ঃ তাহলে … কি সবাই মরে যাবে? তুমিও মরে যাবা? আমিও মরে যাব?
ঃ হ্যাঁ, একদিন সবাই মরে যাবে, আল্লাহর কাছে চলে যাবে।
ঃ আমি মরে গেলে কান্না করবে?
ঃ হ্যাঁ করবো তো। সবাই কান্না করবে।
ঃ … তারপর কি হবে?
ঃ তারপর একদিন সবাই ভুলে যাবে…। আমি কিছুটা উদাস স্বরে বলি।

ঃ নাহ… চাই না। আমি আল্লার কাছে যেতে চাই না…। তুমিও যাবা না। কেউ যাবা না। শুধু নানা যাবে?
ঃ শুধু নানা কেন? নানা – দাদা- বাবা- মা সবাই যাবে একদিন।
ঃ তখন কি হবে?
ঃ তা তো জানি না মা!
ঃ তখন কি সবাই কান্না করবে? সবাই মরে যাবে?
ঃ টেকনিক্যালি তুমি মারা গেলে সবাই মারা যাবে। কোয়ান্টাম ফিজিক্স তাই বলে। অবজার্ভারের অস্তিত্বই প্রমান করে অবজেক্ট আছে। নাইলে সব ফাঁকা…।

ঃ কোয়ান্টাম কি বাবা …?
ঃ সে এক বিরাট ইতিহাস…।

গল্প এখানেই শেষ করি আজকে। কোয়ান্টাম নিয়ে আমি নিজেও কম জানি। কিন্তু আলিনা প্রজন্মের জন্য সামনে আসছে কোয়ান্টামের যুগ। আমাদের বিশ্বাস, ধর্ম, অধর্ম, বিজ্ঞান সব কিছুকে কি ভীষন নাড়িয়ে দিয়ে যাবে।

লেখালেখির শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। তখন বিভিন্ন দেয়ালিকা আর কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার ফেরা লেখালেখিতে। মূদ্রনে ভীষন অনীহা আমার। প্রযুক্তি সেই সুবিধা দিয়েছে আমাকে। প্রযুক্তি প্রেমিক বলে আমার লেখায় বারবার চলে আসে এই বিষয়গুলো। আমার সাহিত্য ভাবনা, ঘোরাঘুরি আর কিছু ছবি নিয়ে। একদম সাদামাটা একজন মানুষের মনের কোনে কি উঁকি দেয়?

2 COMMENTS

  1. Awesome Father and Daughter ramblings. These are the finer times I can see. You should have more grown up conversations with your 5 year old and teach them how to think.

Leave a Reply