অন্যান্য

ভেঙ্গে পড়ার সময় –

মানুষের মনে যখন তীব্র যন্ত্রনা হয় তার কিছুটা হলেও সে বাহ্যিক ভাবে প্রকাশ করার জন্য কান্না করে। নাকের জল আর চোখের জলে মিলিয়ে মনের দুঃখ কিছুটা হলেও হয়ত লাঘব করতে পারে সে।

আমি পারিনি। আমি কারো কাঁধে মাথা রেখে কান্নার সুযোগ পাইনি। আমার কান্না পেয়েছে কিনা তাও বলতে পারিনা! আড়াইশ মাইলের বেশি দূরে থেকে যখন মুঠোফোনে খবর আসে বাবা আর নেই, আমি তীব্র বিষাদে ডুবে গেছি। যন্ত্রের মত সামনে রাখা কাকড়ার স্যুপ খাচ্ছি। আমার স্ত্রী সজল চোখে আমার দিকে তাঁকাতেই আমি তাকেও মৃদু ভর্তসনা করেছিলাম। বাকি খাবার আর খেতে পারিনি।

নাহ…কান্না করিনি, শুধু জানতাম এই মানুষটার মুখের কথা আর শুনতে পাবো না।

আমার পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি জুড়ে যে শ্যমলা-কালো পৌঢ় লোকটা, জ্ঞান হবার পর থেকেই যাকে বাবা বলে ডাকি, তাকে আর কখনো দেখতে পাবো না, আর কোনদিন কেউ আমাকে বকা দেবার জন্য চোখ রাঙ্গাবে না, কেউ যাবার সময় বলবে না “সাবধানে যাবি” – আমার ভেতরটা তখন কুকড়ে কুকড়ে যাচ্ছে বিশাল এক আত্মগ্লানিতে। আমি আড়াইশ মাইল দূরে বসেও বুঝতে পারি শেষবারের মত তিনি আমাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন তার চারিদিকে। আমার ঘোর কাটে না… আমি ঈশ্বরের উপর চরম বিরক্ত হই। আমার ভীষন অভিমান জমে সৃষ্টিকর্তার উপর। আর কটা দিন… কি হত এমন…!

আমার কন্যা আলিনা তখন বালি নিয়ে খেলার এক অদম্য আগ্রহে মত্ত। জগতের অসংখ্য রহস্যের মত মৃত্যুও কেন যেন শৈশবকে স্পর্শ করে না। আমার আবার শৈশবে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে। বাবার হাত ধরে বাজার কিংবা কাঁধে চড়ে স্কুলে, শৈশবের ফেলে আসা বুয়েট মাঠ আর তার প্রিয় অফিসের প্রাঙ্গন, আমাকে সব কিছু কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে।

সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, এরপর মাস কেটে বছর চলে আসবে, আমি কারো কাঁধে মাথা রেখে একটু বুক ফেটে কান্না করতে পারিনি। ইশ্বরের উপর আমার অভিমান এ জন্মেও যাবে না! আমার ভেতরের হাহাকারটা কেউ বুঝতে পারে না।

আমি ঘোর লাগা যন্ত্রের মত প্রতিদিন কি-বোর্ডের বাটন টিপে যাই, কিন্তু কোথাও যেন একটা সুর কেটে গেছে। কি যেন একটা নাই নাই লাগে সারাক্ষন। পুরুষ মানুষ নাকি কাঁদে অনেকদিন পর, গভীর রাতে, কিন্তু আমার রাত যত গভীর হয় আমার কান্না আর আসে না, আমি আকন্ঠ ডুবে যেতে থাকি বিষাদে। আমি যন্ত্রের মতন এ ঘর ও ঘর করি পরিচিত গলার শব্দ আর গায়ের ঘ্রানের জন্য।

প্রথম জন্মদিনে দাদার কোলে আলিনা
প্রথম জন্মদিনে দাদার কোলে আলিনা

আলিনাই ভালো আছে, তার কোন চিন্তা নেই, ভাবনা নেই। একটা মানুষ হুট করে গায়েব হয়ে গেল তাতে তার কিছুই যায় আসে না, আমার শৈশবই ভালো ছিল, আমিও নিশ্চিন্তে জগতের রুপ-রস আর গন্ধে বিভোর ছিলাম। এমন বড় আমি হতে চাইনি, প্রিয়জন হারানোর এই বেদনাটুকু নিয়ে আমাকে অন্তত ভাবতে হত না তাহলে আজ।

আমার কন্যা কে জিজ্ঞেস করলে বলে, আমি জানি দাদা কোথায় গিয়েছে, কিন্তু বলব না। তার কথা শুনে আমি প্রথমবার চমকালেও, শিশু মনের সরলতায় মুগ্ধ হয়েছি। আমি কেন পারিনা এভাবে ভাবতে? আমি কেন জানিনা বাবা কোথায় গিয়েছে?

শহরের এমাথা থেকে ওমাথা যেখানেই যাই, বাড়ি ফেরার সময় হলেই মনে পড়ে কি যেন একটা নেই সেখানে। সব আছে শুধু আমার একটা অংশ নেই, আমার একটা কিছু হারিয়ে গেছে না ফেরার দেশে।

জগতের অমোঘ নিয়তিতে জৈবিক দেহ ছেড়ে সবাই চলে যাবে, আগেও গিয়েছে, একদিন আমারও সময় আসবে। শুধু প্রিয়জন হারানোর এই বেদনা যেন বারবার সহ্য করতে না হয় সেই কামনা করি সৃষ্টিকর্তার কাছে।

যাদের বাবা এখনো বেঁচে আছেন তাদের মত সৌভাগ্যবান বুঝি আর কাউকেই লাগে না আমার কাছে। আমি কন্যার দিকে তাঁকিয়ে তাই মাঝে মাঝে চিন্তা করি, একদিন আমিও কি এই রকম বিষাদময় পরিস্তিতিতে একে ফেলে যাব? কি নিদারুন সেই অভিজ্ঞতা। মাগো … বাবা তোকে অনেক ভালোবাসি… কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায়!

জীবনের খোঁজে আমরা প্রতিনিয়ত জীবন থেকে দূরে সরে সরে যাই। বেঁচে থাকা পাশের মানুষটিকে তাই জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করে – ভালোবাসি… বড় বেশি ভালোবাসি। এই গ্রহ ছেড়ে, লোকান্তরে চলে যাবো হুট করে। তার আগেই মনের আক্ষেপ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বলতে চাই – মৃত্যুটাই স্বাভাবিক, বেঁচে থাকা বড় বেশি বিস্ময়কর!


উতসর্গ, সেই সকল ভাগ্যবানদের যাদের বাবা বলে ডাকার মত কেউ আছেন এই গ্রহে।

মোঃ শাহজাহান কবীর
জন্মঃ আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি।
মৃত্যুঃ ১৪/১২/২০২০

আমি, আলিনা এবং বাবা

মন্তব্য