বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। এরকম বৃষ্টির সময় বারান্দায় পা তুলে দিয়ে এক কাপ চা আর হাতে একটা সিগারেট পেলে অসাধারন হত। কিন্তু আমি সেটা পাচ্ছি না। নিদেন পক্ষে রবীন্দ্রনাথ বা মৌসুমি ভৌমিক চলত ব্যকগ্রাউন্ডে… আমি চোখ বন্ধ করে ভেবে নিতাম হাওড়ে নোকার উপর শুয়ে আছি। পিঠের নিচে পৃথিবী ভেসে চলেছে।

নাহ… যা ভাবি তা হয় না সবসময়।

আমার হাতে হিমুর হাত। নরম হাত, কিছুটা ঘামাচ্ছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় বসে আছি। হিমু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমরা যে কফিশপে বসে আছি সেটা চারতলায়। এখান থেকে বেইলিরোডের রাস্তার একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিতে মানুষজন আর গাড়ির দ্রুত চলে যাওয়া, আর কফি শপের ওয়েষ্টার্ন মিউজিক – সব কিছুই কেমন যেন ঘোর লাগার মত লাগছে। মনে হচ্ছে এ জীবনটা আমি চাইনি, যেখানে নিজের সমস্যারই শেষ নেই সেখানে আরেকজনের এই সকল সমস্যায় পড়ার কোন দরকার নেই আমার।

আজকে দেখা হলে হিমুর কাছে থেকে কিছু টাকা ধার করব ভেবেছিলাম। মাসের প্রায় শেষের দিক পকেটে বিশ টাকার দুটো নোট বাদে কিছু নেই।

ঃ হিমু, কান্না বন্ধ করো, মানুষজন কেমনভাবে তাঁকাচ্ছে দেখছ? মনে করবে তোমার আমার ব্রেকআপ হচ্ছে আর কালপ্রিট আমি!
ঃ মনের দুঃখে একটু কান্নাও করতে পারব না? তোমার দেখি আমার থেকে মানুষজনের চিন্তা বেশি! কে কি ভাবল তাতে কি আমার সমস্যার সমাধান হবে?

আসলেও তো, কে কি ভাবল তাতে হিমুর সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু আমি যে মধ্যবিত্ত মানসিকতায় বড় হয়েছি সেখানে একটু ময়লা জামাকাপড় পরে দামি কোন রেস্তরায় ঢুকলেও নিজের কাছে অস্বস্তিবোধ হয়। সেখানে একটা রুপসী কন্যা আমার হাত চেপে ধরে গত তিরিশ মিনিট ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে যেটা আমার কাছে চরম অস্বস্তিকর সেটা হিমুর বোঝার কথা নয়।

ঃ কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে মনে হয়। এত টাকার কফি নষ্ট করা ভালো হচ্ছে না।
ঃ ক”টা কফি দরকার তোমার? তুমি আমার সমস্যা না দেখে মানুষজন দেখছ, কফির দাম দেখছ!… কফির দামতো আমি দেব তোমার সমস্যা কোথায়?

আমি একটা হাসি দেই …মধ্যবিত্তের হাসি। হিমুর এই কফির টাকায় আমার দুই দিনের মিলের খরচ চলে যেত, কিংবা এক মাসের টিউশনিতে যাওয়া আসার খরচ। আমারও রোমান্টিক হতে ইচ্ছা করে কিন্তু মাঝে মাঝে সমস্যাগুলো এত অদ্ভুতভাবে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে যায় পেটের নাড়িভুড়ির সাথে যে রবার্টফ্রস্ট আর কপচাতে ভালো লাগে না।

আমি হাসি, হিমু কিছুটা বিভ্রান্ত হয়। তার ফোঁপানি কমে এসেছে।

ঃ আজমল, তোমার হাসি পাচ্ছে কেন? আমি কি কোন হাস্যকর কথা বলেছি?
ঃ হাঁসি সংক্রামক, তাই হাসছিলাম। তবে এখন হাসছিলাম তোমাকে কনফিউজ করার জন্য।
ঃ আমি কি কনফিউজড হয়েছি?
ঃ না, কারন তুমি প্রচন্ড শকে আছো, সেটা একটু পরে ঘৃনায় রুপ নেবে। তুমি সাপোর্ট চাইছ নিজেকে জাস্টিফাই করার জন্য, আমি তোমার সংগী হিসেবে সেটা তুমি আমার কাছ থেকে চাইছ।

ঃ আজমল, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তুমি আমাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসো না। শুধু প্রয়োজনে কাছে ডাকি তোমাকে, তুমিও আসো… মন ভরে গেলেই চলে যাও। আমার বাবা যেটা করেছে সেটা কি খারাপ করেনি?

আমি আবারও হাসি। এবার হিমু আরো বিস্মিত হয়।

ঃ তোমার বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। সামাজিক এবং ধর্মীয় কোনভাবেই সে অপরাধ করেনি। তোমাকে বড় করতে গিয়ে সে গত দশ বছর একা কাটিয়েছে। তুমি অবাক হচ্ছ সে কেন তোমাকে বিয়ে করার আগে জানায়নি এজন্য, আর এত বড় মেয়ে থাকতে কিভাবে সে আবার বিয়ে করে তাইতো?

হিমু আমার হাত ছেড়ে দিয়েছে। নরম চেয়ারে হেলান দিয়ে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে আছে। আমি চাইলে সাফাই গাইতে পারতাম কিন্তু সেরকম কিছু না করে সরাসরি এই আদরে বড় হওয়া মেয়েটার খুলির ভেতরে কিছু বাস্তব সত্য ঢুকিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। এই দামি রেস্তরায় ছেলেবন্ধুকে নিয়ে কফি পানের মাধ্যমে দুঃখ উদযাপন করার জন্য যে পকেটের জোর লাগে, বনানী থেকে এখানে আসার জন্য যে প্রাইভেট গাড়ি লাগে সেটাও তার বাবার দেয়া। সেই লোকটাকে জাস্টিফাই করার অধিকার এই সদ্য চব্বিশে পড়া তরুনীর থাকা উচিত নয়।

ঃ আমি কি করব এখন? খালারা, মামারা সবাই ফোন দিচ্ছে, আমি কি বলব? আমাকে সবার কথা শুনতে হচ্ছে।
ঃ তোমার মা মারা যাবার পর গত দশ বছর, তারও আগে তোমার জন্মের পর থেকে এই লোকটা তোমার সকল আবদার পূরন করেছে। তুমি যে জীবন যাপন করে বড় হয়েছ তা অনেকের কাছে স্বপ্নের মত। এই স্বপ্নটা তোমার বাবা দেখেছেন, সেটা তুমি উপভোগ করছ মাত্র।
ঃ তাহলে আরো আগেই কেন তিনি বিয়ে করলেন না? এখন তার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে… এখনই কেন?

আমি কিছুটা হাসলাম। মানুষ কখন, কেন বিয়ে করে সেটা আমি জানি না। একেকজনের কারন একেক রকম হয়ে থাকে। তবে হিমুর বাবার জন্য জৈবিক চাহিদাই প্রধান কারন নয় সেটা অনুমেয়। সেরকম হলে তিনি আরো দশ বছর আগেই কাজটা করতে পারতেন। পঞ্চাশ পেরিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়াটা একটা দুঃসাহসের কাজ। সামজিক লজ্জা তার মধ্যে অন্যতম বাধা। শেষ জীবনে একা থাকাটাও একটা সমস্যা।

ঃ আরো আগে হয়ত তিনি ভেবেছেন তোমার মা-বাবার অভাব তিনি একাই পূরন করতে পারবেন। তুমি তখন অত বড় হওনি যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবে। এখন হয়ত তিনি বিয়ে করলে তোমার কোন সমস্যা হবে না, কিংবা কয়দিন পরে তোমার বিয়ে হয়ে গেলে তিনি একা হয়ে যাবেন। … অনেক কারন থাকতে পারে।

আমি একটু দম ফেলি। একটানা আরো অনেকগুলো কারন আমি দেখাতে পারি কিন্তু হিমুর রি-অ্যাকশন দেখতে চাইছিলাম আমি।

মেয়েটা এখন সোজা হয়ে বসেছে। চোখ থেকে কান্না পুরোপুরি গায়েব। বোবা দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে রাস্তার দিকে।

ঃ তোমার কি মনে হয়… আমার কি করা উচিত এখন? …বাবাকে কংগ্রাচুলেশন জানাবো?

আমি আবার হাসি। হিমু তার স্বভাবে ফেরত আসছে। যে শক নিয়ে সে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল তার অনেকটাই কেটে গেছে। তার খালা আর বাকি লোকজন যে বিষ তার মস্তিষ্কে ঢেলে দিয়েছিল সেটা কিছুটা হলেও সে যুক্তি দিয়ে মাপছে।

ঃ সেটা তোমার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার। আমি আসলে তোমাদের সমাজের আচরনগুলোর সাথে খুব একটা পরিচিত নই। মধ্যবিত্তের মানসিকতায় বড় হয়েছি আমি। ঘৃনা আর হিংসা নিত্যদিন দেখে এসেছি। আমরা ভালোবাসা প্রকাশ করতাম না আর ঘৃণাটা লুকোতে পারতাম না।

ঃ মানে?

ঃ তুমি চাইলে তাকে অভিনন্দন জানাতে পারো। এটা তোমার বাবার কাছেও আন এক্সপেক্টেড হবে। যেহেতু তিনি তোমাকে সহ কাউকেই জানাননি বিয়ে করার আগে, তার মানে তিনি ধরে নিয়েছিলেন তোমরা বাধা দেবে।

ঃ সোজা কথা বল… তোমার এত বিশাল যুক্তি তর্কের খেলা আমি বুঝি না। আমি এখন কি করতে পারি? শান্ত মেয়ের মত সব মেনে নেব?

ঃ শান্ত… না… বরঞ্চ বুদ্ধিমতী মেয়ের মত সব সামলে নেবে। যেভাবে তোমার বাবা তোমাকে সামলেছেন এতদিন, এবার তোমার প্রতিদান দেবার পালা।

আমি হাতের ঘড়ি দেখলাম। প্রায় তিনটা বাজে। সাড়ে তিনটায় একটা টিউশনি আছে। পকেটের যে অবস্থা তাতে হেঁটেই যেতে হবে। হিমুর কাছ থেকে ধার চাওয়া উচিত নয় এসময়। আমার মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্ট বলে- সমস্যা নিয়ে যাকে তুমি উপদেশ দেবে তার কাছ থেকে ধার চাইতে নেই।

ঃ হিমু… আমাকে উঠতে হবে। টিউশনি আছে… না গেলেই নয় ছাত্রীর পরীক্ষা সামনে।

হিমু হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডাক দিল বিলের জন্য। একবারও বলল না টিউশনি বাদ দেয়ার জন্য। মেয়েটার এই জিনিসটা দেখেই আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। অন্যের কাজকে নিজের প্রায়োরিটির সাথে গুলিয়ে না ফেলার মানসিকতা। এটা হয়ত সে তার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে।

ঃ চল তোমাকে পৌঁছে দেই।
ঃ দরকার নেই। এই কাছেই যাব, শান্তিনগর…। কালকে পরশু সারাদিন ছুটি, তুমি যেখানে চাও যেতে পারি।

ঃ হুম… শুনেও না শোনার ভান করে হিমু। আমি আর হিমু পার্কিং এ নেমে আসার পরে হ্যান্ডব্যাগ থেকে ও একটা র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো ছোট বক্স আর একটা খাম আমার হাতে ধরিয়ে দেয়।

ঃ এটা কি? আমি একটু অবাক হই।
ঃ তোমার জন্মদিনের উপহার…। আমি যাবার পর খুলবে। স্মিত হেসে হিমু গাড়িতে উঠে বসে। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে হাত নাড়ি।

আমি নিজের জন্মদিন ভুলে গেছি এটা অবাক করা কিছু নয়! হিমু মনে রেখেছে সেটা কিছুটা আনন্দ দিচ্ছে আমাকে। হিমুর গাড়ি বেরিয়ে গেলে আমি সাবধানে খামটা খুললাম। একটা ছোট চিরকুট আর সাথে পাঁচটা এক হাজার টাকার নোট। আমি চিরকুটটা খুললাম-

“আজমল, তোমার নামটা বদলাতে পারলে বদলে দিতাম। কিন্তু সেটা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই তুমি তোমার মধ্যাবিত্তের যুক্তি দেখানো শুরু করবে। আজকে তোমার না আমার জন্মদিন গাধা। বাবা এখনও বিয়ে করেনি, করবে বলে আমাকে জানিয়েছে! আমি কোন জবাব দেইনি। তোমার অনেস্ট অপিনিয়ন দরকার ছিল, সেটা পেয়েছি। আমি জানি আমাকে কি বলতে হবে এখন।

বিঃদ্রঃ আমার জন্মদিন ভুলে যাবার জন আগামী মাসের সাতদিন আমার সাথে দেখা করতে হবে যখন বলব তখন। তোমার আমার বিয়ে হয়ে গেলে এই আবদারগুলো তুমি আর রাখবে না তাই, শাস্তি…।

আমি কিছুটা হতাশ আর কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। টাকাটার দরকার ছিল, হিমুও সেটা জানত! একটা শুকনো গোলাপের কলি আমি কিনে আনতেই পারতাম। শুভ জন্মদিন বলাতে কোন ক্ষতি ছিল না…।

মেয়েটা আমাকে বোকা বানিয়ে গেল, নাকি কিছুটা মায়া ছড়িয়ে গেল! আমি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শান্তিনগরের দিকে হাঁটা দিলাম। আমার হাতে রংচঙ্গে একটা প্যাকেট আর মাথায় মধ্যবিত্তের হিসেব।

মন্তব্য