অন্যান্য

আলিনা অধ্যায় -১২: বেড়ে ওঠার গল্প

।। এক ।।

আলিনা বড় হচ্ছে। জগতের নিয়মেই বড় হচ্ছে। আর দশটা সাধারন বাচ্চা যেভাবে বেড়ে ওঠে সেভাবেই তার বেড়ে ওঠা। করনার ভয়াল থাবা হয়ত তার শৈশবের দুই বছর একটু এলোমেলো করে দিয়ে গেছে, কিন্তু এর বেশিরভাগই তার মনে থাকবে না। শিশুরা সব মানিয়ে নেয় খুব দ্রুত। আমাদের যেটা ভুলতে লাগে দশ বছর তারা দশ মিনিটেই সেটাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়।

যে ধুলোবালি আর স্কুলের বারান্দা তার পাবার কথা ছিল, তার থেকে কিছুটা সে পিছিয়ে পড়েছে। অস্থির সময়ের হিসাব শিশুরা মনে রাখবে নাকি, কে জানে? আমার শৈশবে কোন মহামারীর দিন কাটাতে হয়নি। আমার কেটেছে আমপাতা, নারিকেলের ছাউনি, কাঠের লাটিম আর লাল-সাদা ঘুড়ির সুতোয় চড়ে।

আলিনার সময় কাটে শপিং মল, মোবাইল আর কম্পিটার স্ক্রীনে। মহামারীতে এভাবেই বদলে গেছে জীবন।

মাঝে মাঝে আমরা রিকশায় ঘুরতে বের হই। এই শহরে যাবার খুব বেশি জায়গা নেই। আমাদের সবুজ পার্কগুলোও বড় বেশি অনিরাপদ শিশুদের জন্য। সেখানেও শৈশব অবাঞ্ছিত। আলিনার সাথে আমার বেশিরভাগ উচ্চমার্গীয় দার্শনিক কথাবার্তা রিকশাতেই হয়ে থাকে। কারন এই একটা সময়েই সে বুঝতে পারেনা এখন সে কি করবে!

এই ব্যপ্যারটায় একটা গবেষনা করে দেখা দরকার! রিকশায় বসে দু-জন মানুষ যখন কোথাও যাচ্ছে তাদের হাতে কিছুই করার থাকে না। তারা তখন আশে পাশের মানুষ আর চলমান গাড়িই শুধু দেখে। নিজের ব্যস্ততা রেখে একটু ফুসরত মেলে চোখ মেলে অন্য মানুষের দিকে তাঁকানোর।

আমরা তখন আজিমপুর কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। সদ্য একটা কবর খোড়া হয়েছে, কারো দাফন হচ্ছে। আলিনাকে সেদিকে দেখালাম।

ঃ বাবা মানুষ মরে যায় কেন?
ঃ তার সময় ফুরিয়ে গেছে এই জন্য।
ঃ কিসের সময়…?

ঃ সেটাতো আমি জানি না মা। একেকজনের সময় একেক রকম ঘড়িতে চলে। তবে সবাইকে মরতে হবে। দাদা মারা গেছে, বাবা মারা যাবো একদিন তুমি মারা যাবে, সবাই মারা যাবে। আমি কিছুটা দার্শনিক ভাব নিয়ে বলি। কিন্তু আলিনা পাত্তা দেয় না।

ঃ… আমার মনে হয় তুমি আগে মারা যাবে… তারপর আমি মারা যাবো…। কারন বুড়োরা আগে মারা যায়… আর তুমি বড় হতে হতে বুড়া হয়ে যাচ্ছ।

আমি এবং রিকশাচালক দুজনেই হেসে দিলাম আলিনার সোজা হিসেব শুনে।

ঃ নারে মা… কে কখন মারা যাবে কেউ জানে না। কেউ ছোট অবস্থাতেই মারা যাবে আবার কেউ বুড়া হয়ে, কোন নিশ্চয়তা নাই। কত মানুষ এক্সিডেন্ট হয়ে বুড়া হবার আগেই মরে যায়।

এই জবাব যদিও আলিনার খুব একটা পছন্দ হল না।

আমাদের সময় আসলে ফুরিয়ে আসছে। ঘড়ির কাটা সবসময় টিকটিক করছে। সময় বাড়ছে না, কমছে। আমাদের বরাদ্দ সময় আমরা খরচ করে ফেলছি খুব অবহেলায়। যে সময় প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটার কথা ছিল, সে সময় আমরা ঘৃনা আর অবসাদে ব্যয় করে ফেলছি।

জীবনের শেষ সময়ে অনেক বিত্তবান লোককেও বলতে দেখা গেছে আর কিছুটা সময় যদি তার পরিবারের সাথে কাটাতে পারত তবে সে তার সব সম্পদ দিয়ে দিত।

।। দুই ।।

একটা সময় এসে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার আদরের সেই ছোট শিশুটা বড় হয়ে যাচ্ছে। তার নিজস্ব যুক্তি, অভিমান আর ভালো লাগা না লাগার একটা আলাদা জগত তৈরি হয়েছে। সে যতই বড় হতে থাকবে বয়স যত বাড়তে থাকবে তার সে ইচ্ছার পরিধি আর ঘুরে বেড়ানোর আকাশটাও বড় হবে।

আলিনা অধ্যায় -১২: বেড়ে ওঠার গল্প 1

আপনাকে তখন মুঠো খুলতে হবে। মানুষ একজায়গায় খাঁচায় বসে থাকার প্রানী না। তারপরেও মায়ার টানে আমরা নিজেরা যেমন আটকে যাই, অন্যদেরকেও বেঁধে রাখতে চাই দৃষ্টি সীমার ভেতরে। এটা উচিত নয় এবং সম্ভবও নয়। মায়ার বাঁধন যে কাটাতে পারবে না সে জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা থেকেই বঞ্ছিত হবে।

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় হয়। যতদিন আমরা বেঁচে আছে স্বপ্ন দেখতে বাধা কোথায়? আর স্বপ্ন যদি দেখি তবে বড় কিছু হবার বা করার স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে দোষ নেই।

আলিনা বড় হচ্ছে জগতের নিয়মে, কিন্তু জীবনের পাঠ এর শুরু তার যেখান থেকে সেখানেই তাকে আমি স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলাম। জানিনা সেটা কতটা সফল হবে। ভবিষ্যত নিয়ত পরিবর্তনশীল।

আমি তাকে গ্রহ-তারা আর মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানিয়েছি, চেষ্টা ছিল তাকে ছোট থেকে বুঝিয়ে দেয়ার আমাদের এই নীল গ্রহটাই সব নয় এর বাইরেও একটা জগত আছে। সৃষ্টিকর্তা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন না, তার আরো অনেক কিছু করার আছে অসীম মহাবিশ্বে।

আমার শিশুকালে কেউ আমাকে আকাশের পরে কি আছে বলেনি। আমরা দৈত্য-দানো আর জুজুর ভয়ে বড় হয়েছি। আলিনাকে কখনো ভুতের ভয় দেখিয়ে খাওয়াইনি, ডাকাতের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াইনি। তবুও সে ভয় পায়।

অন্ধকারের ভয়। একটা অদ্ভুত কারনে সে অন্ধকারের ভয়ে ভীত, হয়ত আমরা সবাই তাই।

শোবার ঘর থেকে পানি আনতে ডাইনিং রুমে গেলে সে আমাকে ডাকে। আমি যদি জিজ্ঞেস করি কেন নিজে নিজে যাচ্ছ না? সে পরিষ্কার উত্তর দিয়েছে আমাকে, ” I am scared of (the) Dark”!

অবাক হইনি, সে ভুতের ভয়ে ভীত নয়, অথচ আমার ছোটবেলায় আমার উত্তর থাকত সেটাই। আলিনা অন্ধকারের ভয়ে ভীত।

হোমো সেপিয়েন্সরা জীনগতভাবে অন্ধকারের ভয়ে ভীত। অনেক আগে থেকেই আমাদের জন্য অন্ধকারে ওঁত পেতে থাকত হিংস্র শিকারী জন্তু। আগুনের ব্যবহার শেখার পরে তাই আগুন হয়ে ওঠে অন্ধকারে আমাদের বন্ধু আর আত্মরক্ষার প্রধান হাতিয়ার। আমাদের জানার পরিধি ছিল অনেক কম, দৃষ্টিশক্তি ছিল ক্ষীণ, তাই অন্ধকারের অজানায় আমরা সহজেই ভীত হতাম। সেই ছয় মিলিয়ন বছরের মজ্জাগত ভয় কয়েক হাজার বছরেও মুছে যাবার কোন কারন নেই।

বড় হতে হতে আমাদের সরল মনের এই অন্ধকারে ভয়টা আমদের চরিত্রে ঢুকে যায়, কারো কারো চরিত্র হয়ে যায় চরম অন্ধকার রাত্রির মত, আমাদের সমাজে এরকম পিশাচ চরিত্রের অন্ধকার মানুষের অভাব নেই।

শিশুরা তাদের মত না হোক… বেঁচে থাকার আনন্দটাই শিশুর মত সরল মনে পেতে হয়।

মন্তব্য