অন্যান্য

আলিনা অধ্যায় -১১: মাইন ক্র্যাফটের দিনলিপি

|| এক ||

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন বাবার হাতে বেশ মার খেতাম “আউট বই” মানে নভেল পড়ার জন্য। তিন গোয়েন্দা, বিল্লু-চাচা চৌধুরি থেকে শুরু করে মাসুদ রানা সবই ছিল আমার প্রিয়। শুধু বাসায় নয়, বরঞ্চ এই সকল বই পড়া স্কুলেও নিষেধ ছিল। স্কুলে একটা লাইব্রেরী ছিল আমাদের, কিন্তু সেটা থাকত তালা বন্ধ। শুধু একবার ম্যাগাজিনের ছবি তোলার জন্য আমাদের সেখানে নেয়া হয়েছিল।

পড়াশোনার বাইরে আমাদের কার্যক্রম খেলাধুলাতেই সীমাবদ্ধ থাকত। সে-দিন গত হয়েছে। আমাদের চিন্তায় এবং মননে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমাদের বাচ্চারা এখন আর পড়তে আর খেলতে আগ্রহী নয়। তাদের খেলার মাঠ আর খোলা আকাশ শহুরে পরিবেশে সংকীর্ন হয়ে আসছে প্রতিনিয়ত।

আমাদের বাচ্চারা এখন ইন্টারনেট আর ডিজিটালাইজেশনের এক যুগে পদার্পন করেছে। আমাদের সময় যা ছিল ধরা ছোয়ার বাইরে তা এখন হাতের নাগালের টাচ স্ক্রিন আর কি-বোর্ডের বাটনে চলে এসেছে।

আলিনাও এর ব্যাতিক্রম নয়। আলিনার পিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দুনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি চলে প্রযুক্তির আশির্বাদে। পিতা হিসেবে আমি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে পছন্দ করি। তাই অন্যারা যখন প্রযুক্তির অভিশাপ খুঁজে বেড়ায় আমি তখন এর আশির্বাদকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করি।

আলিনা বই পড়া কখন শিখবে আমি জানি না, কিন্তু সে মোবাইলে গেইম খেলা শিখে গেছে। মোবাইলে যত গেইম ডাউনলোড করে তার বেশিরভাগই সে খেলে না। প্রচুর বিজ্ঞাপন তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলার অন্যতম কারন। কিছু গেইমের ইন্সট্রাকশন সে বুঝতেও পারে না, তখন দৌড়ে আমার কাছে আসে অর্থ বলে দেয়ার জন্য। কিছু আমি বলে দিই, আর কোন কোন সময় বাধ্য করি তাকে মনে রাখার জন্য।

আমি স্বেচ্ছায় কেন তাকে মোবাইল গেইম খেলতে দেই?

কারন আমি নিজেও গেইমিং এর ভক্ত। যতটা খারাপভাবে এর কুফলগুলো প্রচার করা হয়, এর উপকারিতাগুলো ততটাই নিরবে রয়ে যায়। গেইমিং যে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে নানাভাবে সহায়ক তা অনেক অভিভাবকই বিশ্বাস করতে পারেন না।

আমাদের অভিভাবকেরা বেশিরভাগই যা নিজেরা দেখেননি বা করতে পারেননি তাতে একটা সংশয় রেখে চলেন। হয়ত একারনেই তারা মনে করেন তার বাচ্চাকেও একইরকম ভাবে চলতে হবে।

না… আলিনার মোবাইলে আসক্তি জন্মায়নি। বাবা হিসেবে আমি ঠিক করে দিই কোন গেইম সে খেলবে আর কতক্ষন খেলবে।

|| দুই ||

মাইনক্রাফট

মাইনক্রাফটের নাম শোনেনি এরকম গেইমার পৃথিবীতে পাওয়াটা দূর্লভ হবে। আমারে মেয়েকে আমি গেইমটা কিনে দিয়েছি স্বেচ্ছায়। প্রথমদিকে তার একটু অনিহা থাকলেও এই গেইমের সহজ একটা আকর্ষন করার ক্ষমতার কাছে তা উড়ে গেছে। এখন শুধু নিজে নিজেই খেলে না আমাকেও তার সাথে যোগ দিতে হয়।

প্রথমদিকে তাকে একা একা খেলতে দিয়েছিলাম এরপর এক এক করে মাইনক্রাফটের ল্যান গেইম, সার্ভারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি, পিসি ভার্সনের সাথে পরিচয় হয়েছে। মাইনক্রাফট আলিনার কাছে এখন অসাধারন আগ্রহের একটা বিষয়।

মাইনক্রাফটের বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ, বরফ, মরু আর সবুজের সমাহার, সেই সাথে আছে পানির নিচের আজব দুনিয়া। যা খুশি বানাও, যেখানে খুশি যাও। একটা গেইম কতটা ক্রিয়েটিভ হতে পারে সেটা মাইনক্রাফট না খেললে বোঝা যাবে না।

আলিনা নিজেকে এখন মাইনক্রাফট-প্রো বলে বেড়ায় 🙂 । আমিও এতে খুব একটা মানা করতে পারিনা। কারন বর্তমানে মাইনক্রাফট সে আমার থেকে ভালো খেলে।

আপনার বাচ্চাকে মাইনক্রাফট গেইম খেলতে দিতে পারেন। এখানে সে নানা জিনিস শিখবে। উধাহরন দেই, কিভাবে পাথর এবং কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, কিভাবে ব্লকের পর ব্লক সাজিয়ে একটা ঘর বা বিল্ডিং, ব্রিজ, ট্রি-হাউজ বানাতে হয়, সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে চলে না আসলে জম্বি আক্রমন করতে পারে, পানিতে চলতে গেলে কিভাবে নৌকার ব্যবহার করতে হয়, ইত্যাদি নানা বিষয়।

বাইরের দেশের কিছু স্কুল মাইনক্রাফটের আলাদা একটা ভার্সন ব্যবহার করে বাচ্চাদের কোডিং এবং অন্যান্য জিনিস শিখিয়ে থাকে। এই গেইমের মূল থিমটাই হচ্ছে আপনার ভেতরের ক্রিয়েটিভিটিকে বের করে নিয়ে আসা। বাচ্চাদের জন্য যদি ১০ টা গেইম আমাকে লিস্ট করতে বলা হয় তবে আমি মাইনক্র্যাফটকে এক নম্বরে রাখব।

আলিনা নিয়ম করে আমার সাথে মাইনক্রাফট খেলতে পছন্দ করে। একজনের থেকে দুজন খেলাটা বেশি মজার। কাউকে যদি তোমার সৃষ্ট শিল্পকর্ম নাই দেখাতে পারো তবে তাতে কোন আনন্দ নেই। এজন্য সে আমাকে সারাদিন মনে করিয়ে দেয় কখন খেলতে হবে। মাঝে মাঝে আমাকে তোয়াজও করে বেড়ায় একটু বেশি সময় খেলার জন্য।

কিন্তু বিপত্তি বাধে খেলা শুরু হওয়া মাত্রই, গেইমের পুরো নিয়ন্ত্রন তার থাকতে হয়। কারন সে মাইনক্রাফট-প্রো, আর আমি বেশি দ্রুত জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে পারিনা বলে।

গেইমের ভেতরেই সে স্কুল বানায়, শপিংমল আর সুইমিংপুল বানায় আর আমাকে অংশগ্রহন করতে হয় কখনও ক্রেতা বা ছাত্র হিসেবে। শেষবার একটা রোলার কোস্টারও বানিয়েছিল। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই তার সৃষ্টিশীলতায়। আমার নিজেরও এত ধৈর্য থাকে না এত বিশাল স্ট্রাকচার বানানোর।

আর কখনো যদি আমি তার কথামত কাজ না করি গেইমের ভেতরে, তবে সে তলোয়ার নিয়ে আমাকে তাড়া করে “পানিশমেন্ট” দেবার জন্য। ব্যপারটা খুবই হাস্যকর দাঁড়ায় যখন আমি দূরে পালিয়ে যাই আর সে আমাকে খুঁজে পায় না। তখন আমার চুল টেনে দেয়া কিংবা মায়ের কাছে বিচার দেয়া অবধারিত।

আমি খুশি আমার কন্যা আমার সাথে বেশি সময় ব্যায় করতে পারছে এমন একটা বিষয়ে যাতে আমাদের দুজনেরই আগ্রহ আছে।

|| তিন ||

আলিনা নানু বাসায় গিয়েছে। বাবাকে সে মিস করে। আমার সাথে তার ভিডিও কলে কথা হচ্ছে।

ঃ তুমি নাস্তা করেছ মা?
ঃ করেছি তো…!
ঃ এখন কি করছ…?
ঃ এখন খেলা করি… তুমি খেয়েছ বাবা?
ঃ হুম… খেয়েছি।
ঃ কি খেয়েছ?

আমি ঈষৎ হেসে বললাম “বিরিয়ানি”।

ঃ জানি … তো। আমরা না থাকলে তুমি সবসময় বিরিয়ানি খাও…।
ঃ হাঃ হাঃ … কে বলেছে তোমাকে?
ঃ আমি জানি… কারন বিরিয়ানি তোমার ফেবারিট।

আসলেই বিরিয়ানি আমার প্রিয় খাবার, কিন্তু তাই বলে আলিনার কথামত সবসময় খাই না। পুরান ঢাকায় থাকার কারনে বিরিয়ানিটা মাঝেমাঝেই বাসায় চলে আসে। আমার মেয়ের ধারনা তার মা না থাকলে আমি সবসময় বিরিয়ানি খাই। নানা জায়গার বিরিয়ানি আমার খেয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু শুধু বিশেষ কিছু দোকানের রান্নাই আমার পছন্দ। পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে অসংখ্য পোলাও-কাচ্চির দোকান থাকলেও সবার রান্না ভালো নয়।

|| চার ||

জগতটাই ব্যস্ততার। ব্যস্ততা শেষ হলেই ছুটি। এই ব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রিয়জনের সাথে যতটা বেশি সময় পারা যায় কাটিয়ে দিতে চাই। এই বৃষ্টি আর আলো ছায়ার মাঝে, ইট কাঠের দেয়াল আর রাস্তার ধুলো পেরিয়ে যতটা বেশি সম্ভব স্মৃতি রেখে যেতে চাই ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে।

তাইতো এখনও বৃষ্টি হলে ছাদে চলে যাই ভিজতে। বাবা বৃষ্টি ভালোবাসে, এই স্মৃতি যেন রয়ে যায় কন্যার মনে।

আলিনা অধ্যায় -১১: মাইন ক্র্যাফটের দিনলিপি 1
পেছনে লুকিয়ে থাকা আলিনা

ভালো থাকুক তারার সন্তানেরা, এই গ্রহের প্রান্তরে।

মন্তব্য