শুধু ফেইসবুক নিয়ে লেখাটা বোধহয় একটু ভুল। আমি আসলে সোশ্যাল মিডিয়ার পুরো জগতটাকে নিয়ে লিখতে পারলেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। কিন্তু ফেসবুকের নাম বারবার প্রথমে চলে আসে এর বিশাল ব্যাপ্তি আর সময়ের সাথে সাথে এর শক্তিশালী হওয়াকে কেন্দ্র করে।

বেশ কিছুদিন আগেও একটা লেখা লিখেছিলাম “সোশ্যাল মিডিয়ায় কি শেয়ার করা উচিত আর কি নয়” তা নিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল কিছু মানুষকে অন্তত ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা। জানি না কতটা উপকার হয়েছে। কথায় আছে না, চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনী।

আমরা ফেইসবুক নামক একটা বায়বীয় আশায় বন্দী 1

ফেইসবুকে আমরা কি করি? ৯০ ভাগ লোক আ্মাদের দেশে ফেইসবুক ব্যবহার করে সময় কাটানোর একটা মাধ্যম হিসেবে। বিনোদনের অভাব এই দেশে লোকজন ফেইসবুক নামক সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেই যত হাঙ্গামা করতে পছন্দ করে।

ব্যক্তি জীবনের সব অবদমিত রাগ, ক্ষোভ আর হতাশা ঝাড়ার জায়গা হোল এই ফেইসবুক। পলিটিক্যালি অসচেতন বাঙ্গালী ফেইসবুকে এসেই সরকার, বিরোধিদল এবং দেশের চোদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে হৃষ্ট মনে ঘুম দেয়। সকালে উঠেই আবার হতাশার জীবন আবার সেই একই চক্র এবং ফলাফল ফেইসবুকে আনন্দ খোঁজার বৃথা চেষ্টা।

খুবই অদ্ভুত ভাবে দেখবেন ফেইসবুকে সবার মাঝেই ভালো সাজার একটা অক্লান্ত চেষ্টা থাকে। কে পর্দা করল আর করল না, কার নামাজ পড়া উচিত আর উচিত না, কোন দলকে ভোট দেওয়া দরকার ইত্যাদি বিষয়ে অনবরত চাপাবাজি করে চলেছে। এদের বেশিরভাগই ব্যক্তি জীবনে ব্যপক নোংরা। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলেন, পার্কিং করেন, ঘুষ দেন অথবা খান। কিন্তু ফেইসবুকে আসলেই তিনি চরম ভালো সাজার চেষ্টা করেন।

এই মেকি লাইফ তার পছন্দ।

নিজে হয়ত পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েনা, কিন্তু ফেইসবুকে বসে ধর্ম, হাদিস আর পর্দার ব্যাপারে বিশাল বক্তা হয়ে যান।

কিন্তু কেন আমরা এই রকম করি? কেন আমরা ভালো না হয়েও ভালো সাজার চেষ্টা করি?

এটা একটা বায়বীয় সমস্যা। মানূষ হিসেবে আমরা সবাই চাই অন্যরা আমাদের মূল্যায়ন করুক। যথাযথ মূল্যায়ন না পেলে আমাদের ইগো হার্ট হয়। প্রচুর ইগোওয়ালা লোকজন এই কারনে ফেইসবুকে প্রচুর ভার্চুয়াল মারামারি করে থাকেন।

মানব প্রজাতি হিসেবে আমরা ছোটবেলা থেকেই মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করি। বাচ্চারা বারবার তাদের বাবা-মাকে ডেকে এটা ওটা দেখানোর চেষ্টা করতে থাকে সারাক্ষন। তারা চায় সবাই তাদের দিকে অখন্ড মনযোগ দিক।

বড় হবার পরেও আমাদের সেই অভ্যাসটা পুরোপুরি যায় না। কারো মনোযোগ পেলে আমরা বর্তে যাই। কারন আমরা সাধারন মানুষ, নিজেকে সবসময় অবচেতনে দূর্বল এবং অযোগ্য ভাবি। তাইতো সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু সুযোগ পেলেই আমরা দেখাতে চাই আমরা কতটা ভালোভাবে সব কিছু করতে পারি, আমরা চাই অন্যরা আমাদের মূল্য দিক।

কোথাও খেতে গেলে আমরা ছবি তুলি খাবারের ফেইসবুকে দেবার জন্য, ঘুরতে গেলে সেলফি তুলি, চেক-ইন দেই। এখন আবার সাথে যুক্ত হয়েছে ইন্সটাগ্রাম নামক এক দুনিয়ার।

কি দেখাই আমরা?

কত ভালো রেস্টুরেন্টে খেয়েছি, কোথায় ঘুরেছি, কত পয়সা খরচ করতে পারি আমি…ইত্যাদি।

এ সকল ছবি, কমেন্ট এবং স্ট্যাটাস শুধুই আমাদের ইগো ভরানোর কাজে লাগে। বাস্তবের আমরা সেই বায়বীয় আশাতেই রয়ে যাই। আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না। এক অসুস্থ প্রতিযোগিতিয়ায় নামিয়ে দেই আমরা নিজেদের।

কেউ আমদের ছবিতে লাইক না দিলে, খারাপ কমেন্ট করলে আমরা আরো হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ি। ধরে নেই আমারই বোধহয় কোন ভূল ছিল। এই চক্র ক্রমাগত চলতেই থাকে।

প্রযুক্তি একটা অসাধারন বিষয়, কিন্তু প্রজন্ম প্রস্তুত হবার আগেই আমাদের হাতে তা চলে আসার আগে তার ভালো ব্যবহারের বদলে আমরা খারাপ ব্যবহারটাই বেশি করছি। ফেইসবুক নামক একটা জিনিস বাঙ্গালীর জীবনে শান্তির থেকে অশান্তিই নিয়ে এসেছে বেশি।

কিন্তু, ফেইসবুক কি ভালোকাজে লাগানো যায় না?

জ্বী, যায়। শিক্ষিত হস্তে ফেইসবুক মারাত্বক এক মাধ্যম। ব্যবসা, যোগাযোগ, জরুরী প্রয়োজনে রক্তের সন্ধান, বাসা খোঁজা, রাজনৈতিক মতামত যাচাই-বাছাই করা সব কিছুই করা যায় এখানে।

সমস্যা হল, আপনি কতটা শিক্ষিত সেটা নিয়ে। দোষটা যতটা না ফেইসবুকের, তার থেকে বেশি এর অশিক্ষিত ব্যবহারকারীদের।

আজকে আপনি যখন আমার এই লেখা পড়ছেন এবং লেখার এই পর্যন্ত ধৈর্য নিয়ে পড়েছেন, আমি ধরেই নিচ্ছি আপনি অন্যদের থেকে একটু বেশি সচেতন। দেখুনতো আপনি নিজে ফেইসবুককে কি কাজে ব্যবহার করেন?

অন্যদের মত আপনিও কি ফেইসবুককে নিজের ইগোর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন? অযথা চেক-ইন, খাবারের ছবি, অন্যের ছবিতে গালাগালি করা, সাইবার-বুলিং করা, অতিরিক্ত ধর্ম উপদেশ ইত্যাদি দিয়ে বেড়াচ্ছেন?

যদি উত্তর না হয়, তবে আপনে বেঁচে গেলেন। আর যদি হাঁ হয় তবে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন কেন এইগুলো করছেন। এর ফলে আপনার কি ধরনের লাভ হচ্ছে? আর্থিক না মানসিক?

আমাকে কমেন্টে জানান। আমি বুঝতে চেষ্টা করব।

আমরা ফেইসবুক নামক একটা বায়বীয় আশায় বন্দী 2

ফেইসবুকে কি করা উচিত আর কি করা উচিত না?

আপনার মনে রাখা উচিত ফেইসবুক একটা খোলা বাজারের মত। আপিনি রাস্তা-ঘাটে, মাঠে যেটা প্রকাশ করতে চান না সেটা ফেইসবুকে লিখবেন না।

ধরেন আপনি কক্সবাজার ঘুরতে যাবেন, তাহলে আপনি নিশ্চই আপনার বাসার ছাদে উঠে চিৎকার করবেন না, “আমি কক্সবাজার যাই”। সবাই দেখেন, আমার বাসা ফাঁকা, চাইলেই এখন চুরি করতে পারেন।

আপনার বন্ধুর পোস্টেও তাকে গালি দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কারুন তার আত্মীয় স্বজন, মুরুব্বি গোছের লোকজন, ছোট-বড় অনেকেই তার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকতে পারে। আপনি বিব্রতবোধ না করলেও, তার গায়ের চামড়া হয়ত এত মোটা না।

এইত কয়দিন আগেই দেখলাম একজন তার ফেইসবুকে বিয়ের ছবি শেয়ার করে লিখেছে, হুট করেই সব হয়ে গেল, কাউকে জানাতে পারিনি 🙂

আমি পড়লাম আর ভাবলাম, ” ওয়েল সেইড মাই বয়, হুট করে রাস্তা থেকে একটা মেয়ে এনে তোমাকে ধরে দিয়ে বলা হল এটাই তোমার বউ” 🙂

অনেকটা ছিনতাইকারীর কাছে ধরা খাওয়ার মত। যাক বিয়েতে অনেক শুভ-কামনা রইল। কিন্তু বিয়ে-শাদী হুট করে হয় না। অনেক মাইরপিট করে হয়। সবাইকে দাওয়াত দেয়াও পসিবল না। আর দিলেও বেশিরভাগ আসে না, কারন এই যুগে দাওয়াত খেতে যাওয়টাই একটা বিপত্তি।

এবার ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে। ফেইসবুক নিয়ে অনেক চুলকানো হয়েছে। যার যা খুশি শেয়ার করুক। শেষ কথা একটাই, প্রযুক্তি কাজে ব্যবহার করুন, আকাজে নয়। ফেইসবুক এর স্ট্যাটাস, লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার আপনাকে বড় করবে না। করবে মানুষ হিসেবে বাস্তবে আপনি কি করেন।


লেখালেখির শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। তখন বিভিন্ন দেয়ালিকা আর কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার ফেরা লেখালেখিতে। মূদ্রনে ভীষন অনীহা আমার। প্রযুক্তি সেই সুবিধা দিয়েছে আমাকে। প্রযুক্তি প্রেমিক বলে আমার লেখায় বারবার চলে আসে এই বিষয়গুলো। আমার সাহিত্য ভাবনা, ঘোরাঘুরি আর কিছু ছবি নিয়ে। একদম সাদামাটা একজন মানুষের মনের কোনে কি উঁকি দেয়?

Leave a Reply