অন্যান্য

জন্মদিন, করোনা ভ্যাক্সিন এবং অন্যান্য

জন্মদিনটা প্রতিবছর একবার আসে আবার চলে যায়। আমার কাছে এটা তেমন উল্লেখযোগ্য কোন দিন নয়। সেকারনেই ফেইসবুক এবং অন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি লুকিয়ে রাখি জন্মদিনের তারিখ যদি উপায় থাকে। অহেতুক কারো কাছ থেকে অভিনন্দন শুনতে ভালো লাগে না। আহ্লাদিত হবার বয়স পার হয়ে এসেছি।

মানুষের হিসেবের দিন, তারিখ, সময় এই সবগুলি আসলে কাল্পনিক একটা ধারনা। পৃথিবী কয়দিনে সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসল সেটা গুনে, কতক্ষনে পৃথিবী একবার নিজের অক্ষের উপর ঘুরল এর উপর ভিত্তি করে সময় গোনা -আসলে একটা আপেক্ষিক বিষয়। আমাদের হিসেবের একদিন আর অন্য গ্রহের একদিন সমান হবে না। কাজেই সময় দিয়ে আমরা যে বয়স বা দূরত্ব মাপি সেটাও আসলে ইউনিভার্সাল স্টান্ডার্ড নয়।

এজন্যই আলোক বর্ষে যে দূরত্ব মাপা হয়, সেটা আমার বেশ ভালো লাগে। এটা সবসময় একই হবে। কারন আলোর গতি ইউনিভার্সাল কন্সট্যান্ট (কিছু বিশেষ পরিস্থিতি বাদে)।

জন্মদিনে প্রথম কাজ ছিল ঘুম থেকে উঠেই করোনার ২য় ডোজ ভ্যাক্সিন নিয়ে আসা। প্রথম ডোজ টিকা নেবার সময় কিছুই টের পাইনি। কখন সুঁই ঢুকল আর কখন টীকা দিল। কিছুটা আড়ষ্টতা সহ নির্বিঘ্নেই কাটিয়ে দিয়েছি। তখন টীকা নিতে লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি।

এবার গিয়ে দেখি জনা বিশেক আমার আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সবার টিকা কার্ড নিয়ে গেল সামনে বসে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী। সিল এবং সাইন দিয়ে আবার ফেরত দিচ্ছে।

কি আশ্চর্য্য…! লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই মোবাইলে মেসেজ চলে এসেছে আমার টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আমার সামনের লোকটা হাসছে। কিন্তু আমার হাসি না দুঃখ হচ্ছিল। ঠিক এই কারনেই করোনার টীকা ফার্মেসীতে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। টিকা দিয়ে বের হবার পর সাইন দেখে এটা আপডেট করলে কি এমন ক্ষতি হত?

যথা নিয়মে আমরা সরকারের দুরবস্থা নিয়ে কিছুক্ষন মশকরা করলাম। সময় কাটানোর জন্য আমিও যোগ দিলাম এই বিলাপে।

ঃ ভাই সুঁই নিতে আমার ভয় লাগে।
ঃ ভয়ের কি আছে! আমি কিছুটা তাচ্ছিল্লের সুরে বলি, চিকন সুঁই কিছু টের পাওয়া যায় না।
ঃ ব্যাপার সেইটা না, কিন্তু সুঁই দেখলেই ভয় লাগে। এই পর্যন্ত আটবার রক্ত দিসি, কিন্তু সুঁই দেখলে ভয় লাগে।

হঠাত করে সামনে থাকা এই লোকটার জন্য আমার শ্রদ্ধা আর সম্মান বেড়ে গেল। আমি কিছুটা সমীহ করে বললাম, তাহলে এত বার রক্ত দিলেন কি করে?

ঃ ঐ যে চোখ বন্ধ করে ফেলি। কোনভাবেই রক্ত দেয়া শেষ হবার আগ পর্যন্ত হাতের দিকে তাঁকাই না।

সামনের লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না মাস্কের কারনে, তবে তার হাসি প্রসারিত হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সে টিকা দেয়ার আগেই তার ভ্যাক্সিন সার্টিফিকেট নামাতে পেরেছে। দেশ ডিজিটালাইজেশনের এমন এগিয়েছে, কিছু লোক চাইলেই এখন টিকা না দিয়েও সারটিফিকেট পেয়ে যেতে পারবে!

প্রথম টিকা আমাকে ভোগায়নি, এবার মনে হল ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে নার্স আমার বাহুতে সুঁই চেপে ধরেছে। তখনই বুঝেছি এইবার খবর আছে। পরের একদিন পুরোটা গেল আমার ঘোরের মাঝে। হালকা ড্রিংক করার পর যেরকম লাগে অনেকটা সেরকম। নিজের উপর যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি সামান্য টিকাতেই কাবু হয়ে যাওয়ায়!

বাসায় ফিরে আবার সেই গৎবাঁধা ভাবে কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া একই জীবন একই রুটিন, আমাকে প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় কোন দিনই বিশেষ নয়। বিশেষ হচ্ছে সাথে থাকা মানুষগুলো, আমাদের সম্পর্কগুলো। এতে ঘুন ধরলেই আলো ঝলমলে অট্টালিকাও নিরানন্দ লাগতে বাধ্য।

গেলাম বিয়েবাড়ী, যদিও কন্যার ইচ্ছে ছিল কোন বুফেতে যাওয়া। কারন এর আগে সে দেখেছে সেখানে অনেক রকম খাবার সাজানো থাকে আর চাইলে যেকোনটা খাওয়া যায়।

জন্মদিন, করোনা ভ্যাক্সিন এবং অন্যান্য 1
বুফেতে যাইনি বলে মন খারাপের আলিনা

চরমভাবে অখাদ্য এক কালাভুনা দিয়ে পোলাও খেলাম ফাঁকা রাস্তা দেখতে দেখতে।

জন্মদিন, করোনা ভ্যাক্সিন এবং অন্যান্য 2

নয়তলার উপর বসে এই খাবারের থেকে রাস্তাটা আর ব্যাকগ্রাউন্ডের সংগীত অনেক বেশি মনোহর ছিল।

ভাগ্যিস আমি কোন পলিটিক্যাল ফিগার নই। নাইলে ২১শে আগষ্ট জন্মগ্রহণের কারনে অনেক হ্যাপ্যায় পড়তে হোত। আমাদের আবার সবকিছুতেই বেশি বেশি, পরিমিতিবোধ বলে কিছু থাকে না।

পকেটে দশ টাকা না থাকলেও আমরা আইফোন নিয়ে ঘুরে বেড়াই। বিয়েতে দশ-পনের লাখ টাকা খরচ করি মানুষ খাওয়াতে অথচ এর পরেই নতুন দম্পতি ঋন করে বেড়ায়, কনের বাপকে জমি বেচতে হয়।

আমাদের বেকারেরা বসে থাকে চাকুরির আশায়, সম্মানজনক কেরানীগিরির জন্য। আমাদের সব কিছুতেই প্রচন্ড মেকি মেকি ভাব।

বয়স পঁচিশ হয়ে যাবার পর আমি আর কিছুতেই খুব বেশি অবাক হই না। আমি কাউকেই খুব বেশি কাছে ডাকি না। জীবনের হিসেব নিকেশ অনেকটাই বুঝে গেছি আমি ততদিনে। এখন আমি শুধু হতাশ হই। মানুষের সীমাহীন মূর্খতা, নীচতা আর ভন্ডামিতে আমি হতাশ হই। কারন এটা শোধরানোর কোন উপায় নেই। এরা এভাবেই থাকবে মৃত্যু পর্যন্ত। আর পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়ে যাবে এই ঘৃনার বিষবাষ্প।

গত দু’বছরে করোনা কালীন সময়ে আশেপাশের এত পরিচিত মানুষের মৃত্যু সংবাদ শুনেছি যে মৃত্যুটাও এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে আমার কাছে। পরিচিত কারো মৃত্যুতে ফোন দিয়ে কি বলব, কিভাবে স্বান্তনা দেব সেটাও জানি না। শুধু চুপ করে সময় গুনে চলি, পৃথিবীর সময়… এবার কার পালা।

তবুও এই হিংসা, ঘৃনা আর অহেতুক মেকি হাসি, আর সভ্যতা পিছিয়ে দেয়া যুদ্ধ চলবেই। কারন মানুষ বদলায় না, শুধু মরে যায় একসময়।

মন্তব্য