মাতাল

মাতাল 1

সিড়ি দিয়ে নামতে নামতেই হাতের ফোনটার দিকে একবার তাকাল রাসেল। অমিতাভের কল। ধরবে নাকি ধরবে না চিন্তা করতে করতেই ধরে ফেলল। মন মেজাজ খুব ভালো বা খারাপ না থাকলে অমিতাভ কখনও ফোন করে না ধরেও না।

ঃ কিরে কি অবস্থা? তোর কোন হদিস নাই। গত সপ্তাহেও কল করেছিলাম ধরিস নাই।

রাসেল কিছু বলল না। শুধু “হুম” উচ্চারন করল। কিছু বলার মত মনের অবস্থাও নাই। মেয়েটাকে নিয়ে গত মাস থেকেই বাসা আর হসপিটাল দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে জীবনের অনেক কিছু শেখা হয়ে গেছে। এক মাসেই একশ বছরের অভিজ্ঞতা বেড়ে গেছে রাসেলের।

সবাই আসে সমবেদনা দেখায়, তারপর টুক করে চলে যায়। সাথে কিছু ফলমূল নিয়ে আসে। রাসেল বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো নিয়ে বাসায় চলে যায়। তার মেয়ে নুসাইবার ফল খাওয়ার মত অবস্থা নাই এখন। ফেলে দিতেও কষ্ট লাগে। মানুষ এত কষ্ট করে কিনে আনে টাকা খরচ করে।

রাসেল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। টাকা যে কত বড় বন্ধু হাসপাতালে না আসলে বোঝা যায় না। যার টাকা বেশি তার টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। সারভাইবাল অফ দ্যা ফিটেস্ট।

ঃ কথা বলিস না কেন? কোথায় তুই?
ঃ হাসপাতাল থেকে বের হলাম মাত্র। রাসেল ছোট্ট করে উত্তর দেয়।
ঃ ও… । অমিতাভ এ ব্যাপারে আর কিছু বলে না। জানতেও চায় না।
ঃ আমি গুলশান-১ এ আছি, আসবি? রাতে তোকে বাসায় পৌছে দেব। লেকসাইডে আছি। লোকেশন শেয়ার করে দিচ্ছি তোকে।

অমিতাভ বারে বসে মদ খাচ্ছে রাসেল শিওর। মেয়েকে হাঁসপাতালে রেখে বারে যাওয়াটা ওর কাছে কেমন যেন লাগল হঠাত করে। একবার ভাবল না করে দেয়। পরক্ষনেই আবার মন পাল্টাল।

ঃ আসছি তিরিশ মিনিট এর মত লাগবে। এখানে সিএনজি নেই, দেখি উবার পাই কিনা।

ঃ অকে আয়… আমি খাবার অর্ডার করলাম না তাইলে। তোর সাথেই খাবো।

রাসেল আর কথা না বলেই ফোন কেটে দিল। উবার আসতে আসতে আরো দশ মিনিটের মত লাগবে। একটা সিগারেট ধরাল সে।

কি হবে বাসায় গিয়ে? মা তো নুসাইবার সাথে হাসপাতালেই আছে আজকে। একা বাসায় ফিরে কি করবে? খাবার রুচিও নাই। তারচেয়ে অমিতাভের বকবকানি শুনেই আসা যাক।

সিগারেট শেষ হবার আগেই উবার চলে এসেছে। টোকা দিয়ে ফেলে দিয়ে গাড়িতে উঠল রাসেল।

ডিভোর্সের পর থেকে অমিতাভের চলাফেরায় পরিবর্তন হয়েছে প্রচুর। যখন তখন ড্রিঙ্ক করতে চলে আসে, হুট হাট করে দেশের বাইরে চলে যায়। কিন্তু নারী সঙ্গ সম্পুর্ন ছেড়ে দিয়েছে। মনে হয় বউটার উপর অভিমান করেই।

প্রথমদিকে সবাই বেশ তাল মেলালেও আস্তে আস্তে বন্ধুদের সাথেও তার একটা দুরত্ব তৈরি হয়ে যায়। আসলে পাগলামি আর মুক্ত মানুষকে সবাই সহ্য করতে পারে না। কোন একটা অদ্ভুত কারনে অমিতাভ আবার রাসেলকে একটু বেশিই পছন্দ করে।

সেই স্কুল জীবন তারপর বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গাতেই অমিতাভ রাসেলের পাশে ছায়ার মত থেকেছে। কিন্তু বিয়ে করার পর কেমন যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। নিজের অফিস, ব্যস্ততা, বাসা সামলে আর আগের মত সময় কাটানো হয় না সবার সাথে।

সবাই যখন বলত বিয়ের পরে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় বন্ধুদের মাঝখানে, রাসেল বিশ্বাস করত না। কিন্তু এখন বুঝতে পারে ব্যপারটা। আগের সেই সময় ছাড়া লাগামহীন আড্ডা আর হয় না। যা হয় কাজের কথা।

জেরিন ও হঠাত করে তাকে আর নুসাইবাকে ছেড়ে চলে গেল পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। ছোট্ট মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল তার পৃথিবীর একটা অংশ আর নেই। আগের সেই ওম ভরা কোলটা আর সে খুঁজে পাচ্ছে না। মা বলে ডাকার মত কেউ নেই পাশে। সেও প্রায় বছরখানেক আগের কথা।

নুসাইবা সামলে নিয়েছিল। মার বদলে দিদিমার কোলে খুঁজেছে আশ্রয়। আর রাসেল সামলে নিয়েছিল নুসাইবাকে আকঁড়ে ধরে। শিশুরা অনেক কিছু বড়দের থেকে ভালোভাবে রপ্ত করতে পারে। শুরু হচ্ছিল তাদের জীবন আবার।

কিন্তু বছর না ঘুরতেই তাদের তিনজনের সংসারে আবার আঘাত। নুসাইবার হার্টে একটা ছিদ্র ধরা পড়ল। মাঝে মাঝেই রাসেলের মনে হয় সৃষ্টিকর্তা তাকে বোধহয় বাংলা ছবির নায়ক হতে পাঠিয়েছে। মা মরা একটা মেয়েকে মাত্র চার বছর বয়সে এত ঝামেলা দেয়ার কি দরকার!

ঃস্যার চলে এসেছি

রাসেলের চিন্তায় বাধা পড়ে। ভাড়া মিটিয়ে নীল রঙের বিল্ডিংটার সামনে এসে দাঁড়ায়। আরেকটা সিগারেট ধরায়। অমিতাভকে কি বলবে কিছু টাকা ধার দেবার জন্য? চিন্তা করছে। অমিতাভ কি জানে ওর মেয়েটা হাঁসপাতালে ভর্তি? রাসেলের এখন টাকা দরকার অনেক।

জীবনে কখনো হাত পাতেনি বন্ধুদের কাছে রাসেল। যা ছিল তাই খরচ করেছে, না থাকলে ইচ্ছার লাগাম টেনে ধরেছে। কিন্তু এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে। আর অমিতাভ ওর দূরের কেউ না। সেই বাচ্চা কালের বন্ধু। ও যদি না বুঝতে পারে তবে কে বুঝবে!

বাবা মারা যাবার পর মা-ই বড় করেছে রাসেলকে এই ব্যস্ত শহরে। তাদের দুইজনের সংসারে অমিতাভ ছিল মুক্ত হাওয়ার মত। অবাধ যাতায়াত, আড্ডা ঘোরাঘুরি। রাসেলের কোন ভাই নেই। থাকলে কি অমিতাভের মতই হোত?

এই সব সাতপাঁচ ভাবছিল রাসেল নিচে দাঁড়িয়ে। এই সময় বারের এক ওয়েটার এসে তাকে ডাকল।

ঃ রাশেদ স্যার আপনার জন্য উপরে ওয়েট করছে। রাশেদ উপরে তাঁকাল। ঘোলা কাঁচে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উপর থেকে বোধহয় দেখা যায়। অমিতাভের ডাকনাম রাশেদ।

রাসেল গিয়ে দেখল অমিতাভ বেশ আরাম করে একটা কুশনে বসে আছে কাঁচের দেয়াল ঘেষে। নিচটা পরিষ্কার দেখা যায় এখান থেকে।

ঃ কিরে, নিচে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন? এখানে আরাম করে এসির মধ্যে বসে সিগারেট খা।

ঃ এমনিই। রাসেল আবার ছোট্ট করে জবাব দেয়। মাঝে মাঝে নানান কথা ঘুরপাক খায় মাথার মাঝে, তখন পা আর চলে না। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছিলাম।

ঃ হুম…খুব ঠিক কথা। যাদের ব্রেইনে র‍্যাম কম তাদের এরকম হয়, আমার এক চাচা ছিল এরকম। সে যখন তখন হাসতে হাসতে বসে পড়ত, বলত হাসি আসলে নাকি সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

অমিতাভ মুচকি মুচকি হাসছে আর রাসেলের দিকে তাকাঁচ্ছে। রাসেলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল হঠাত করে। সারকাজম শোনার মত মনের অবস্থা তার নেই।

ঃ এই কারনেই তোর বউ তোর সাথে থাকে নাই।

রাসেল ভেবেছিল এই কথা শোনার পর অমিতাভের মুখ কালো হয়ে যাবে। কিন্তু অমিতাভের হাসি বন্ধ হলো না।

ঃ সে গেছে… তার ইচ্ছা হয়েছে। আমার থেকে ভালো খেলোয়াড় পেয়েছে, খেলতে গেছে। মেয়েরা আসলে উচ্চাকাংখী হয়। তুই যতই বাটার দিস না কেন, দেশী ঘি ইজ দেশী ঘি। বিদেশী সস ও দেশী ঘি এর থেকে ভালো। দেখিস না ইন্ডিয়ান মাল কিভাবে মার্কেট দখল করেছে মেয়েদের কাছে।

রাসেলের মন খারাপ হয়ে গেল। কথাটা এভাবে না বললেও পারত ও। এতদিন পরে বন্ধুর সাথে দেখা। খোঁচাখুচি করার কি দরকার ছিল?

ঃ সরি, তোকে হার্ট করার জন্য বলিনি।
ঃ জানি বলিসনি, তোকে আমি মায়ের পেট থেকে বের হয়েই চিনি। অমিতাভ তার সহজাত হাসিতে জবাব দেয়।

রাসেল ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

ঃ কি খাবি বল? আজকে পরটা আর চিকেন এদের স্পেশাল ম্যেনু। ফ্রাইড রাইসও আছে। আর সাথে তুই যা নিতে চাস। নে মেন্যু দেখ।
ঃ একটা কিছু দিয়ে দে। আর আমি মদ খাই না…। তুই খা। মন মেজাজ ভালো নেই।

অমিতাভ আবারো হাসে।

ঃ খাস না জানি, আজকে খা। আজকে একটা স্পেশাল ডে।
ঃ আজকে কি?
ঃ আর কিছুক্ষন পরে রাত ১২ টা বাজলে আমার জন্মদিন। অমিতাভ হাসে। তুই আর আমার বউ সবার আগে আমাকে উইশ করতি। বউতো ভেগে গেছে বিদেশে, তুইতো ব্যস্ততায় সব ভুলেই যাচ্ছিস। তাই ভাবলাম নিজেই তোকে ইনভাইট করে নিয়ে আসি।

ঃ হ্যাপি বার্থডে বন্ধু…। রাসেল কিছুটা লজ্জিত স্বরে বলে। আসলে নানা চাপে থাকতে থাকতে সব ভুলেই যাচ্ছি ইদানিং।

ঃ কিসের চাপ? চাকরি চলে গেছে এই জন্য? বলেই অমিতাভ জিভে কামড় দিল।
ঃ তুই জানিস? কবে থেকে…।
ঃ যখন গেছ…… মানে ছেড়েছিস তখন থেকেই। আন্টি সবার আগে আমাকেই ফোন করেছিল।
ঃ তুই জানিস আমার মেয়ে হাঁসপাতালে?
ঃ জানি।
ঃ সেটাও কি মা বলেছে?
ঃ হ্যাঁ।
ঃ একবারও দেখতে আসলি না, ফোন করে খবর নিলি না। আর আজকে আমাকে মদ খেতে বারে ডাকছিস। রাসেল কষ্টের একটা হাসি দেয়। এই কারনেই ও হাসপাতাল থেকে বের হয়েছে জেনেও অমিতাভ কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
ঃ তোকে একবার ফোন দিয়েছিলাম গত সপ্তাহে, ধরিস নাই। আর আন্টির সাথে প্রতিদিনই কথা হয় আমার। তোর সাথে হয় না। ধরে নে আমি অভিমান করেছি।
ঃ কার উপর?
ঃ তোর উপর বোক…দা।
ঃ কেন?
ঃ এই যে আমার জন্মদিন ভুলে গেলি তাই। যার বউ ভেগে যায় আসলে তারে কেউ দাম দেয় না।

এবার রাসেল আর অমিতাভ দুজনেই হেসে দিল। প্রানখোলা হাসি। আশেপাশের টেবিল থেকে অনেকেই তাঁকাচ্ছে।

ঃ শোন হসপিটাল আমার ভালো লাগে না। আর নিজের বাচ্চা কাচ্চা নাইতো তাই খুব বেশি মায়া পড়েনা কারো উপর। গেলে কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। কখন কোন ডাক্তার দেখে বলবে, এই যে, আপনারতো লিম্ফোসিটাইটি কংজুনাভাইটিস হয়েছে। এখনই এই এক্সরে, ইসিজি আর আলট্রা করিয়ে আনুন।

রাসেল হাসল।

ঃ এই রোগ তুই বানিয়েছিস?
ঃ হুম…। আসল কথা আপেল, আঙ্গুর, কমলা নিয়ে হাঁসপাতালে যেতে আমার ভালো লাগে না। কেমন আছে, বাচঁবে না মরবে এইগুলা জিজ্ঞেস করে আমি কোন বালডা ছিড়ব?
ঃ আসলে অন্তত আমার সাথে আড্ডা দিতে পারতি।
ঃ ওরে, আমি আপেল আঙ্গুর কিনতে গেলেই ওরা পঁচাটা ধরিয়ে দেয়। সেটা খেলে তোর আর আন্টির পেট ব্যাথা হোত।

রাসেল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

ঃ পেইনে আছি দোস্ত, জলের মত টাকা যাচ্ছে। যা সেইভিংস ছিল সব গেছে। এখন হাত পুরা ফাঁকা। মা কার কার কাছ থেকে টাকা ধার করে আনছে জানি না। অফিস থেকে লোন চেয়েছিলাম দেয়নি, ছুটিও দিবে না। তাই চাকরিটাই ছেড়ে দিলাম। মেয়েটার কিছু হলে এই বালের চাকরি করে আমার কি হবে?

ঃ দাঁড়া অর্ডার করে নেই। খেতে খেতে তোর কান্নাকাটি শোনা যাবে।

রাসেল আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আজকে এইখানে অমিতাভ খাবার এ যে দশ বারো হাজার টাকা খরচ করবে সেটাও রাসেলের গায়ে লাগছে। ওর নিজের পকেটেও এখন অত টাকা নেই।

ঃ তো শুরু কর এবার তোর কান্নাকাটি। চাকুরি ছাড়াটা বোকামি হয়েছে তোর। ছাড়ার আগে আমাকে একবার বলতে পারতি।
ঃ আসলে হুট করে এত কিছু ঘটে গেল গত এক মাসে। আর আত্বীয় স্বজনের যে চেহারা দেখলাম। মা যে ধার করছে সেগুলা শোধ করব কি করে তাও বুঝে উঠতে পারছি না। রাসেলের গলা ধরে আসে। কান্না কানা ভাব। বন্ধুর চোখের দিকে তাঁকাতে চাচ্ছে না।

ঃ শোধ করতে হবে না। অমিতাভ হাসিমুখে বলে।
ঃ মানে?
ঃ মানে তোকে ধার শোধ করতে হবে না।
ঃ কেন? রাসেল কিছুটা আশ্চর্য হয়।
ঃ আন্টি কারো কাছ থেকে ধার করেনি। আমি আন্টিকে টাকা দিচ্ছি যখন যা লাগে। তুইতো রেগে যাস কিছু বললেই, তোর আবার আত্বসম্মানবোধ সদা জাগ্রত তাই আন্টিকে বলেছিলাম তোকে না জানাতে।
ঃ তাইলে এখন বললি কেন?
ঃ তোর কান্নাকাটি দেখে নেশা কেটে যাচ্ছে। বউটাও চলে গেল, নেশাও ধরে না। এত দামী মাল খাই তাও কিছু হয় না।
ঃ কথায় কথায় বউ টানবি না। আর তুই মাকে টাকা দেয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করিসনি কেন?
ঃ করলে কি বাল ফেলতি তুই? ধন্যবাদ দিতি? নাকি তোর ইগোর বিচিতে ব্যাথা লেগেছে এখন শোনার পর।
ঃ মা তোর কাছ থেকে এমনি এমনি টাকা নিল?
ঃ শোন তোর মা তোর মত একটা নিরেট গর্ধভরে এই ঢাকা শহরে একা একা বড় করেছে। তোর থেকে বেশ ভালো বুদ্ধি রাখে এই মহিলা। তুই চাকুরি ছাড়ার পর সেদিন রাতেই আন্টি আমাকে ফোন করেছিল।
আমি বলেছি তুই আর আমি মিলে একটা ব্যবসা শুরু করেছি এখনো পুরোপুরি দাঁড়া হয়নি কিন্তু এই সময় তোর টাকার দরকার। তাই আন্টির একাউন্টে টাকা দিয়েছি। তোকে যেন না জানায় সেটাও বলেছি।
ঃ মা কিছু বোঝেনি?
ঃ আলবৎ বুঝেছে… তোর মত গর্ধভ নাকি। আমি যে মিথ্যা কথা বলেছি সেটাও উনি জানেন। কিন্তু এখন দরকার ক্যাশ… ক্যাশ ইজ দ্যা ডার্লিং বেইবি। … এই যে খাবার চলে এসেছে।

রাসেলের বুকের ভেতরে যে চাপা কষ্টটা ছিল সেটা কেমন যেন একটু একটু কমে যাচ্ছে। নিজেকে অনেক নির্ভার লাগছে। বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, নাকি মায়ের প্রতি অভিমান বুঝতে পারছে না। চোখটাও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।

ঃ এই খবরদার এখানে কান্নাকাটি করবি না। আমি এমন কোন মহাপাপ করি নাই। আন্টি তার এক ছেলের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে আরেক ছেলের প্রয়োজনে।

ঃ না কাঁদছি না। আমি নিজেকে একা আর অসহায় ভেবেছিলাম তাই নিজের উপর কষ্ট হচ্ছে।
ঃ তুই গর্ধভ।
ঃ দে মাল খাবো, একটা ককটেল দিতে বল।
ঃ আনিস ভাই… এইখানে দুটা মার্গারিটা দেন। আমিতাভ হাতের ইশারায় বেয়ারাকে ডাকল।
ঃ তোকে ধন্যবাদ দিয়ে…
ঃ তোর বিচিতে ইগো বেশি… আমার টাকা আছে তাই দিয়েছি। আমি দান খয়রাত করি না। জগতের সব বাচ্চাই নুসাইবা না। সবাই আমার বন্ধুর মেয়েও না। আইন যেমন সবার জন্য সমান না, সবার জীবনের ভ্যালুও এক রকম না। নুসাইবা একটা দামি প্রোডাক্ট তার ইন্টেক্ট থাকা দরকার। এই সব ফুটা-ফাটি যা আছে তাতেই কাজ চলে যাবে। নতুন একটা ফুটা দিয়ে কি করবে মেয়েটা?

রাসেলের এত কষ্টেও হাসি পেল।

ঃ তুই শোধরাবি না।
ঃ কি হবে? আমার বউ আবার আমার সাথে খেলতে আসবে?
ঃ সব সময় মুখ খারাপ করিস কেন?
ঃ আমি খারাপ তাই। শোন… পাফার ফিস দেখেছিস কখনো?
ঃ না…।
ঃ পাফার ফিস হল একটা সামুদ্রিক মাছ। এরা যখন আক্রান্ত হয় তখন গোলগাল হয়ে যায় আর একটা টক্সিন ছাড়ে। তাতে বড় মাছগুলো আক্রান্ত হয় আর এই ফাঁকে পাফার ফিস পালিয়ে যায়।
ঃ তো…? রাসেল মার্গারিটায় চুমুক দেয়।
ঃ দুর্ভাগ্যবশত এই টেকনিক ডলফিনের উপর খাটে না। পাফার ফিসের টক্সিনে ডলফিনের কিছু হয় না বরং একটা নেশা নেশা লাগে। তাই এরা ইচ্ছা করে পাফার ফিসকে খোঁচায় নেশা করার জন্য। মাঝে মাঝে একটা ডলফিন আরেকটা ডলফিনের কাছে পাফার ফিসকে পাস করে দেয় পিলো পাসিং এর মত। অনেকটা আয় ভাই এক লগে নেশা করি।

ঃ হাঃ হাঃ। তুই এত কিছু জানিস কেন?
ঃ এইটা আমার অভিশাপ। বেশি জানি দেখেইতো মদ খাই। কিন্তু মাতাল হই না।
ঃ সব মাতাল একই কথা বলে। রাসেল হাসল।
ঃ আমারে মাতলামি করতে দেখেছিস কখনো?

রাসেল মনে করতে পারল না। আসলেই অমিতাভ কখনো মাতলামি করে না।

ঃ তবে আজকে মাতাল হবার ট্রাই করব। তারপর তুই আমাকে তোর বাসায় নিয়ে যাবি। সকালে আমার ফ্লাইট আছে। এয়ারপোর্টে দিয়ে আমাকে তারপর হাঁসপাতালে যাবি।
ঃ কই যাবি তুই? রাসেল এতক্ষনে দেখল অমিতাভের পায়ের কাছে একটা ছোট সাইজের ট্রাভেল ব্যাগ।
ঃ ফ্রান্স।
ঃ কি দরকার… বিজনেস?
ঃ না খেলতে…।
ঃ মানে? এত হেঁয়ালি করে কথা বলিস আজকাল।

ঃ রাসেল, আমি কি করি বলতো, বিজনেস। পারিবারিক ভাবেই অনেক টাকার মালিক আমরা। আমি সেটা আরো বাড়িয়েছি। কিন্তু নিজেকে বড় একা একা লাগে মাঝে মাঝে। সব থেকেও কি যেন নেই।
আমি হচ্ছি ঐ পাফার ফিসের মত। আর আমার বউ সহ আশেপাশে যারা সবাই তারা ডলফিন। নেশা করার দরকার পড়লে এই অধমের কথা মনে পড়ে সবার।

ঃ হয়েছেটা কি বলতো!

ঃ তোর ভাবি মানে এক্স ভাবি, আমার এক্স বউ, ফ্রান্সে গিয়া টাকা পয়সা সব হারায় ফেলসে এখন সেখানকার জেলে আছে। দেখি কি ব্যবস্থা করা যায়। মনে হয় তার প্লেয়ার ম্যাচ ছেড়ে চলে গেসে। অমিতাভ মুচকি হাসল।

ঃ তো তোর কি? সে তো তোকে ডিভোর্স দিয়েই গেছে। এখন আবার তোর সাথে যোগাযোগ করেছে?
ঃ হুম…।
ঃ তুই তাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছিস?
ঃ দেখি কি করা যায়। কিছু পরিচিত লোকজন আছে। বিজনেস করিতো নানা দেশের মানুষের সাথে টুকটাক আলাপ থাকে। আগে যাই তারপর দেখা যাক। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা?

রাসেল তার বন্ধুর দিকে অনেক্ষন তাকিয়ে থাকল। অমিতাভ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধুম্রজাল পাঠিয়ে দিল কাঁচের দেয়ালে।

ঃ তোর রাগ হয় না? যে মানুষটা তোকে ছেড়ে চলে গেল তার জন্য আবার এতদূর যাচ্ছিস।
ঃ কি করব বল। ওর মা ফোন করে কান্নাকাটি করে। সে বিশাল লম্বা কাহিনী অন্যদিন বলব।
ঃ প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা হয় না?
ঃ হয়…তো… একশবার হয়। যদি ওকে ছাড়াতে পারি একই ফ্লাইটে করে দেশে নিয়ে আসব আর খেয়াল রাখব সিট যেন আলাদা আলাদা থাকে। পুরোটা রাস্তা ভাবতে ভাবতে আসবে আমি কি করছি। লজ্জায় কৃতজ্ঞতাও জানাতে পারবে না।
ঃ এতে তোর কি লাভ?
ঃ নারীর কাছে দূর্বোধ্য পুরুষ হল সবথেকে বড় যন্ত্রনার মত। আমি কেন ওকে সাহায্য করতে গেলাম, আমার কি লাভ এটা যেমন তুই ভাবছিস সেও ভাববে। মেয়েরা ছেলেদের খোলা বইয়ের মত পড়তে পারে, শুধু ভাষাটা জানতে হয়। আমি এখন ওর কাছে হিব্রু ভাষার একটা বই।
ঃ ওহ… তুই এত গভীর জ্ঞানী এটা জানতাম না।
ঃ কারন তুই একটা বিচিওয়ালা গর্দভ। ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু আমার ছায়া এড়াতে দেবনা।

রাসেল কিছু বলল না। চিন্তা করছে মানুষের সমস্যাগুলো আসলে কত জটিল হয়। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই।

ঃ মার্গারিটা খা ব্যাটা, সেনোরিটা নিয়ে এত ভাবিস না।
ঃ তুই বিয়ে করিস না কেন আবার? রাসেলের প্রশ্ন।
ঃ কিছু মানুষ জীবনে একবারই প্রেমে পড়ে, তারপর সেই প্রেম ভেঙ্গে গেলে মরে যায়। আমি সেই অভাগাদের একজন।
ঃ তুই কি এখন মরে গেছিস?
ঃ না আমি খেলছি। অমিতাভ অট্টহাসি দেয়।
ঃ আর খাস না, তোকে ধরেছে।
ঃ নাহ, আমার লিমিট জানা আছে। শোন তোর জন্য একটা জব অফার আছে। মাতাল হয়ে বলছি না। আজকে তোর সাথে দেখা করার জন্য এটাও একটা কারন। আমার নতুন প্রজেক্টে ম্যানেজার লাগবে। বেতন তুই যা চাস, মানে এই জবে যা পেতি তাই দেব।
ঃ মাতাল হয়ে বন্ধুকে গোলামি করতে বলছিস।
ঃ নাহ, তোকে আশার আলো দেখাচ্ছি। কিন্তু আমি সিরিয়াস। আশে পাশের সবগুলা ডলফিন। তুই একমাত্র ভরসার স্থান। ফ্রিতে টাকা নিতে তোর বিচিতে লাগবে, ধার চাইলে তোর সম্মান হানি হবে। তুই আমার কাজ করে দে টাকা নে।
ঃ ভেবে দেখব, মেয়েটাকে হাঁসপাতালে রেখে এখন জব করা সম্ভব না।
ঃ সেজন্যই বলছি। তোর যত খুশি সময় নে, ছুটি নে। কালকে একবার আমার উত্তরার অফিসে গিয়ে সব বুঝে আসবি। তুই সেখানকার বস। আগে আমি ছিলাম কিন্তু আমি এখন ব্যাস্ত।

ঃ কি নিয়ে?
ঃ নতুন ম্যাচ হচ্ছে। অমিতাভ আবার মুচকি হাসে। তবে রাসেল বুঝতে পারছে ও আস্তে আস্তে মাতাল হচ্ছে।
ঃ চল ওঠা যাক। কাল তাহলে অনেক কাজ আছে।
ঃ দেখেছিস তোকেই আমার দরকার। কখন কি করতে হবে বলার মত, সাহস দেয়ার মত একজন সাথে থাকা লাগে।

রাসেল হাসল, হাতের ইশারায় বিল দেবার জন বেয়ারাকে ডাকল।

অমিতাভ আবার বলল, মাঝে মাঝে পুরো শহরটাকেই অচেনা মনে হয়। কি যেন একটা নেই নেই লাগে রে দোস্ত। তোর মেয়ের কথা যখন শুনেছি তখনই মনের ভেতর মোচড় দিয়েছিল। অপেক্ষায় ছিলাম তুই কখন আমাকে জানাবি। সেই তুই … ইগোর বিচি কাঁধে নিয়ে বসে রইলি। আমি খারাপ হয়েছি কিন্তু নষ্ট হয়ে যাইনি।
আমি চাইনা তোর প্রিয় পুতুলটা তোকে ছেড়ে চলে যাক। হারানোর ব্যাথা বারবার সহ্য করা যায় না। যত টাকা দরকার নুসাইবার জন্য শুধু একাউন্টস থেকে চেয়ে নিবি।

ঃ হুম, চল।
ঃ চল… অমিতাভ বিল মিটিয়ে টলমল পায়ে দাঁড়াল।
ঃ তোকে ধরতে হবে?
ঃ না… অতটা কিছু হয়নি শুধু তুই একটু ব্যাগটা নে।
ঃ বুঝেছি। মাতাল হলেও হুঁশ হারাসনি। টিকিট পাসপোর্ট কি ব্যাগেই।
ঃ হুম, তুই কি বুঝেছিস?
ঃ বুঝলাম, তোর আশে পাশে সব ডলফিন, তুই একলা পাফার ফিস এখন আমাকেও পাফার বানাতে চাচ্ছিস।

কিছুটা টলতে টলতে দুই বন্ধু নিচে নেমে আসে। অমিতাভের ড্রাইভার গাড়ি বের করতে দৌড় দেয় পার্কিং এর দিকে। ব্যাটা নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল।

অমিতাভ একটা সিগারেট জ্বালায়। এক গাল ধোয়া ছেড়ে রাসেলের দিকে তাঁকিয়ে বলে, পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে শুধু নাটক করে যাবি, দর্শকের রিয়াকশন দেখার দরকার নেই। দেখতে গেলেই পরের নাটক আর করা হবে না।

রাসেল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমিতাভের পেছনে গাড়িতে উঠল। কালকে আবার সারাদিন দৌড়াতে হবে। তবে কেন যেন বুকের মধ্যে সেই চাপা অসহায়ত্বের ভাবটা আর নেই। নির্ভার লাগছে। মার্গারিটার এফেক্ট হতে পারে, আবার অমিতাভও হতে পারে। দুটোই নেশা।

Leave a Reply