সিড়িটা অনেক লম্বা – প্রথমে মনে হয়েছিল শ-খানেক হবে ধাপ। নীলা গুনে গুনে দেখছিল, কিন্তু একসময় হতাশ হয়ে সে গোনা ছেড়ে দিল। হাজারের উপরে গোনা হয়ে গেছে…। প্রতি ধাপে একটা করে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

সবাই ঈশ্বরের সামনে নিজের বিচার দেবার জন্য দাঁড়িয়ে। নীলার ধারনা একদম সিড়ির উপরে বোধহয় ঈশ্বর বসে আছেন। তিনি সবার সব কথা শুনে তারপর ঠিক করছেন কিভাবে কি রায় দেয়া যায়।

নীলা মনে মনে এটাও ভাবছে, ঈশ্বরতো সবই জানেন তাহলে এই দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখার মানে কি? লীনা ভাবে আর এদিক ওদিক তাঁকায়। আশে পাশে যতদূর দৃষ্টি যায় একটু পর পর একটা করে সিড়ি। সেখানে কোনটায় নারী, কোনটায় পুরুষ আর কোনটায় সবাই এক সাথে দাঁড়িয়ে আছে।

সিড়ির ওপরটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। কেমন যেন ঘোলাটে একটা মেঘের আড়ালে ঢাকা। বেশ কয়েকবার চোখ কচলে দেখার চেষ্টা করেও নীলা ব্যর্থ হয়েছে।

অবশেষে দীর্ঘ সময় শেষে নীলা সিড়ির শেষে উপরের ধাপে পৌছে যায়। সেখানে সৌম্য দর্শন একজন ব্যাক্তি বসে আছেন। কিছুটা ধূসর আলখেল্লার মত একটা কাপড় পরে আছেন। বসে থাকার কারনে তাকে কিছুটা ক্লান্ত লাগছে। তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে না তিনি ছেলে না মেয়ে। শরীরে বেশিরভাগ অংশই সামনের পাথরের টেবিলে ঢাকা পড়েছে। কেমন যেন একটা অদ্ভুত মায়াময় চেহারা।

ঃ আমি ভেবেছিলাম ঈশ্বরের দেখা পাব এখানে! নীলা কিছুটা ইতস্ত স্বরে বলে।
ঃ তুমি কি ধারনা করেছিলে প্রতিটা সিড়ির উপরে একজন ঈশ্বর বসে আছেন?
ঃ তিনি সব জায়গায় আছেন, থাকতে পারেন। নীলা হতাশ গলায় বলে।

সৌম্য দর্শন ব্যাক্তি এবার হাসেন। তার চোখে কিছুটা কৌতুকের ছায়া –

ঃ তাহলে এই বিচারের মানে কি? নীলা হতাশ গলায় বলে।
ঃ কিসের বিচার…? মেয়ে এখানে কোন বিচার হতে দেখছ তুমি? আমি তোমার কথা শোনার জন্য বসে আছি। তোমাদের সবার অনেক অনেক কথা জমে আছে সৃষ্টিকর্তাকে বলার জন্য। আমি সেগুলোই শুনব। আর প্রয়োজন মত তার কাছে পৌছে দেব।

ঃ কিন্তু আমি সরাসরি তাকেই আমার অভিযোগ জানাতে চাই। আমার কষ্টটা তিনি বাদে আর কেউ বুঝবেন না। নীলা কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে। 

সৌম্যদর্শন চেহারায় আবার কৌতুকের হাসি ওঠে।

ঃ তুমি এখন সব ব্যাথা আর অপমানের উর্ধ্বে। মৃত্যুর পরে তোমার কোন কষ্ট থাকার কথা নয়।
ঃ কিন্তু আমি অপমানিত হয়েছি বেঁচে থাকতে, আমার মৃত্যুটা ভীষন অপমান আর কষ্টের ছিল।

কিছুটা নড়েচড়ে বসেন এবার সৌম্যদর্শন, তার হাতের লেখার কলমটা থুতনিতে টোকা দেন।

ঃ আমাকে বলে দেখতে পারো। এইতো তোমার আগেই শুনলাম এক মেয়ের গল্প যার মা-বাবা তাকে স্টেশনে রেখে চলে গেছে ইচ্ছা করে। ট্রেনে কাটা পড়ে সে মারা যায়। অথবা সেই ছেলেটার গল্প যাকে নিজের বাবা খুন করেছে প্রতিবেশীর নামে মামলা দেবার জন্য। আমি একটু আগেই শুনেছি এক মায়ের গল্প যাকে নিজের সন্তান বাড়ি থেকে নিয়ে জঙ্গলে ফেলে এসেছিল…… বৃদ্ধ বলে। … আমি সবার কথা শোনার জন্যই বসে আছি।

ঃ আমি কি তাহলে ঈশ্বরের দেখা পাব না? …আমিতো তার দেয়া ধর্মই পালন করতাম… কারো ক্ষতি করতাম না …তবে আমাকে কেন অপমানিত হতে হল?

ঃ কোন ধর্ম পালন করতে তুমি মেয়ে?
ঃ কেন…… ঈশ্বরের দেয়া একমাত্র সত্য ধর্ম…।

আবার একটু ইতস্ত হাসি। নীলা কিছুটা ভয় পায়। তবে কি তার ধর্ম পালনে সমস্যা ছিল?

ঃ সৃষ্টিকর্তার কোন ধর্ম নেই। তিনি কাউকে কিছু পালন করতে বলেননি। তিনি সৃষ্টি করেছেন যখন তখন শাস্তির কথা ভাবেননি! তুমি তোমার কথা বল – আমাকে আরো অনেকের দুঃখের গল্প শুনতে হবে।

ঃ আমি পোষাক শ্রমিক ছিলাম… আমার দেশে আমি খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করতাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে মাঝে মাঝে অনেক রাত হয়ে যেত। একদিন বাসায় ফেরার সময় আমাকে বাসে ধর্ষন করা হয়। তারপর আমাকে মেরে ফেলে রেখে ওরা চলে যায়। আমি বারবার প্রান ভিক্ষা চাওয়ার পরেও ওরা আমাকে বাঁচতে দেয়নি। আমি আমার একমাত্র সন্তানের কাছে ফিরে যেতে পারিনি সেদিন রাতে। আমার বৃদ্ধ মা কিভাবে এখন খাবার খান তাও জানি না……। আমার সন্তান কাকে মা বলে খোঁজে তাও জানি না।

নীলার গলা ধরে আসে কান্নায়, কিন্তু চোখ দিয়ে পানি গড়ায় না। কি অদ্ভুত…! মৃত্যুর পরে কি তাহলে চোখে পানি আসে না? চোখ তুলে নীলা তাঁকায় সামনের দিকে। সোম্যদর্শন চেহারা লোকটা কি যেন লিখছেন একমনে। তার পরনের পোষাক এখন আরো ধুসর হয়ে যাচ্ছে। তার চোখে অশ্রু…।

ঃ তোমার অভিযোগ লিখে নিয়েছি মেয়ে। তুমি এখন নেমে যেতে পারো।

ঃ এই অপরাধের কি কোন বিচার হবে না? আমার কি দোষ ছিল? যে দেশে জন্মেছিলাম আমি সেখানে আমাকেই অপরাধী বানানো হয়েছিল নানা ভাবে, আমার মৃত্যুর পরে। অথচ কেউ একটা বারও আমার বা আমার পরিবারের কথা ভাবেনি। আমিতো ইচ্ছে করে মরে যেতে চাইনি।

ঃ সৃষ্টিকর্তার কোন দেশ নেই, ওটাও তোমাদের বানানো। পৃথিবীর সবাই তার সন্তানের মত।

ঃ তাহলে অপরাধ কি আমার ছিল? জন্মানোটাই কি একটা অপরাধ ছিল আমার?

ঃ তোমার কোন অপরাধ ছিল না মেয়ে। তুমি নির্ভয়ে নেমে যাও। তোমার কষ্টে সৃষ্টিকর্তার অশ্রু ঝরছে। আমার চোখে তুমি তাই দেখছ। আমার পোষাক আরো ধূসর হতে হতে কালো হয়ে যাচ্ছে তোমার কষ্টে। অপরাধ মানুষ করেনি, করেছেন সৃষ্টিকর্তা…।

ঃ কি অপরাধ?

ঃ তিনি মানুষ সৃষ্টি করে অপরাধ করেছেন। তার জন্য তিনি লজ্জিত। এই লজ্জায় তিনি তোমাদের কারো সামনে আসেন না।

সৌম্যদর্শন ব্যক্তি নীলার দিকে তাঁকিয়ে একটা দীর্ঘস্বাস ফেললেন। হাতের কলমটা নামিয়ে রেখে বললেন-

ঃ তোমাদের যেমন আইন-আছে অপরাধীকে শাস্তি দেবার জন্য, সৃষ্টিকর্তার জন্য এরকম কিছু নেই। তার অপরাধের শাস্তি দেবার জন্য কেউ নেই। তার উপরে আর কেউ নেই। থাকলে তোমাকে সেখানেই যেতে বলতাম। এখন তুমি যদি দয়া করে নেমে যাও… তোমার পেছনে অভিযোগের লাইন অনেক লম্বা… আরো আসছে…।
ঃ আমার বিচার কি হবে না?

ঃ জানি না…। সৃষ্টিকর্তাকে জানিয়ে দেয়া হবে, আমরা সবাই তার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি!

সৌম্য দর্শন লোকটা এবার মাথা নিচু করে ফেলে। নীলা সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতে থাকে, পেছনে ধূসর রঙের আলখেল্লা আস্তে আস্তে কালো বিন্দু হয়ে মিলিয়ে যায়।

প্রচন্ড লজ্জিত আর অনুতপ্ত এক ঈশ্বর মানব-প্রজাতি সৃষ্টির লজ্জায়, অনুতাপে, অভিমানে আর অপরাধবোধে তার সৃষ্টি থেকে আরো দূরে সরে যেতে থাকেন।

লেখালেখির শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। তখন বিভিন্ন দেয়ালিকা আর কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার ফেরা লেখালেখিতে। মূদ্রনে ভীষন অনীহা আমার। প্রযুক্তি সেই সুবিধা দিয়েছে আমাকে। প্রযুক্তি প্রেমিক বলে আমার লেখায় বারবার চলে আসে এই বিষয়গুলো। আমার সাহিত্য ভাবনা, ঘোরাঘুরি আর কিছু ছবি নিয়ে। একদম সাদামাটা একজন মানুষের মনের কোনে কি উঁকি দেয়?

Leave a Reply