গল্প

হোমো সুপিরিওর

আশফাক সামনের লোকটার দিকে নিরানন্দ দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে। মনযোগ আকর্ষনের মত কিছু নেই লোকটার মাঝে। এরকম পাঁচ থেকে সাতজন রোগী প্রতিদিন তাকে দেখতে হয়। সবার গল্পই আলাদা, সবার সমস্যাও আলাদা। কিন্তু সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে তার দায়িত্ব সবার গল্পগুলো মনযোগ দিয়ে শোনা। কিন্তু কেন যেন এই লোকটার চোখে একটা কৌতুকের ছায়া প্রথম থেকেই তার ভালো লাগছে না।

কিছু রোগী আসে মাঝে মাঝে এরকম, যারা নিজেরাও জানে না তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া দরকার। তারা মনে করে সামনে যে ডাক্তার বসে আছে তার থেকে সে বেশি জানে, বেশি বোঝে। এদের নিয়ে নানা যন্ত্রনা। এরা সব কিছুতেই ডাক্তারের ভুল ধরার চেষ্টা করে। যদি রোগী তার সাইক্রিয়াটিস্টের উপর ভরসা রাখতে না পারে তবে চিকিৎসা করাটাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। যে সাহায্য নিতে প্রস্তুত নয় তাকে কিভাবে সাহায্য করা যায়?

আশফাক মনযোগ দেয়ার চেষ্টা করল লোকটার দিকে। এ মিটিমিটি হাসছে আর পা নাচাছে। তাঁকিয়ে আছে ছাদের দিকে।

ঃ কি দেখছেন? ওখানে কিছু আছে নাকি? আশফাক নরম স্বরে বলে।
ঃ আপনার ফ্যানের পাখার উপর একটা টিকটিকি বসে আছে। আমি চিন্তা করছি ফ্যান ছাড়লে সেটা এঙ্গুলার মোমেন্টামের কারনে দেয়ালে ছিটকে গিয়ে নিচে পড়বে, নাকি আবার দেয়ালে সেঁটে যাবে?
ঃ পড়বে না। আশফাক উপরে না তাঁকিয়েই বলে।

লোকটা বুদ্ধিমান সেটা জাহির করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আশফাক এই খেলাটা খেলতে চাচ্ছে না আজকে। এ রোগীটাই তার শেষ রোগী আজকে। এখন প্রায় সাড়ে ছটা বাজে। বাসায় যাবার তাড়া আছে। যাবার সময় একটা কেক নিয়ে যেতে হবে। আজকে তার অষ্টম বিবাহ বার্ষিকী। তার ওয়াইফ রিনার ধারনা সে সব কিছু ভুলে যায়। আজকে কোনভাবেই ভোলা যাবে না। তাদের কন্যাও নিশ্চয়ই অধীর আগ্রহে বাবা ফেরার অপেক্ষায় আছে। বাবা ফিরলেই একসাথে বাইরে খেতে যাবার কথা।

ঃ আপনি কিন্তু আপনার নাম বলেননি আমাকে। আশফাক কিছুটা তাড়া দেয়।
ঃ এপয়েন্টমেন্ট নেবার সময় বলেছিলাম তো। লোকটার গলায় আবার সেই কৌতুকের ভাব।
ঃ এখানে শুধু সেন্টু লেখা, বয়স ৩৮ আর আপনার মোবাইল নাম্বার আছে। …একটা ডিজিট আবার মিসিং। আমার এসিস্ট্যান্ট বোধহয় ভুল করে লেখেনি।
ঃ ভুল করে না, আমি নিজেই কম বলেছি একটা সংখ্যা, দেখতে চেয়েছিলাম সে ধরতে পারে কিনা। ধরতে পারেনি, সে বোকা।

আশফাকের ভ্রূ কোঁচকালো একটু। এই রোগীটা জ্বালাবে। আজকে এপয়েন্টমেন্ট না দিলেও পারত শাহেদ। ছেলেটা আসলেও বোকা কিসিমের। মাঝে মধ্যেই ভুল করার জন্য বকা খায় আশফাকের কাছে।

ঃ সেন্টু নিশ্চই আপনার ডাক নাম। আমি পুরো নামটা জানতে চাইছিলাম। নাম না বললে আমাদের সেশন আগাবে কি করে? আপনাকে আমার উপর আস্থা রাখতে হবে।
ঃ নাম বলছি, তার আগে বলুন ফ্যান ছাড়লে টিকটিকিটা পড়ে যাবে না কেন?
ঃ কারন মোমেন্টাম ক্রিয়েট হবার আগেই সে পাখা থেকে ফ্যানের হ্যান্ডেলে চলে যাবে। সেখানেও নিরাপদ বোধ না করলে ছাদে চলে যাবে। তার ছিটকে পড়ে যাবার সম্ভাবনা কম।
ঃ যৌক্তিক ব্যখ্যা। আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে। লোকটা একটু হাসি দিল। এই প্রথম আশফাক লোকটার দাঁতের দিকে খেয়াল করল। একটা দাঁত স্টিল দিয়ে বাঁধাই করা। সচরাচর এখন আর এরকম দেখা যায় না। ডেন্টাল টেকনোলজির অনেক উন্নতি হয়েছে এখন। নকল দাঁতও এখন আসলের মত দেখায়, এর স্টিলের দাঁত কেন?

ঃ আমার নাম B2H-6473…। এবার লোকটির চোখেও হাসি খেলে গেল। আশফাক খেয়াল করল লোকটার চোখের তারা একটু নিলাভ ধরনের। কেমন যেন একটা নিষ্প্রভ নীলচে রঙের খেলা। এতক্ষন কেন খেয়াল হয়নি? কথা বলার সময় সব সময়ই চোখের দিকে তাঁকিয়ে কথা বলে সে। অথচ কিছুক্ষন আগেও চোখের রঙ কালো ছিল বলে মনে হয়।

ঃ আপনি মনে হয় আমার নাম শুনে কিছুটা অবাক হয়েছেন, তাই না আশফাক সাহেব? লোকটা এবার এক পা আরেক পায়ের উপর তুলে দিয়ে শরীরের ভর ডান দিকে ছেড়ে দিল।

আশফাক কোন জবাব দেয়ার আগে চিন্তা করছে। সাধারনত রোগীরা তাকে স্যার বা ডাক্তার সাহেব বলেই সম্বোধন করে। নামে ধরে সাহেব বলাটা আসলে কলিগদের মাঝেই বেশি থাকে।

ঃ এরকম অদ্ভুত নাম কেন? তাহলে সেন্টু কার নাম?
ঃ ওটা বানিয়ে বলতে হয়েছে। আপনাদের সময়ে নামের বড় যন্ত্রনা। সেন্টু বলাতে সহজেই সব জায়গায় কাজ চালিয়ে নেয়া যায়।
ঃ ঠিক আছে বুঝলাম। আশফাক নাম নিয়ে আর তর্ক করতে চাচ্ছে না। পুরো গল্প না শুনলে বোঝা যাচ্ছে না। কথা বলা যে শুরু করেছে এটাই আশার কথা।
ঃ আপনার মনে হয় আমার নাম নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি বানিয়ে বলেছি তাই না? আমার নাম আসলেই এটা। এই সময়ে এসে… আপনাকেই প্রথম আসল নামটা বললাম।

আশফাক ততক্ষনে নোট নেয়া শুরু করেছে, হ্যালুসিনেশন হতে পারে বা সিজোফ্রেনিয়া থাকতে পারে রোগির।

ঃ বলুন সেন্টু সাহেব, আমি কিভাবে আপনার সাহায্যে আসতে পারি?
ঃ আমি আসলে আমার একটা সমস্যার কথা বলতে এসেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না আপনি কিভাবে রিয়েক্ট করবেন। সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
ঃ কোন ভাবেই রিয়েক্ট করব না। রোগীর কথা শোনাই আমার কাজ। আপনার পুরো ব্যাপারটা না জানলে আমি কোন ভাবেই সাহায্য করতে পারব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন… আপনার আমার মাঝে যা কথা হবে তা তৃতীয় কোন ব্যক্তি জানতে পারবে না। একজন সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে এসব নিয়ম আমরা কঠিন ভাবে মেনে থাকি।

লোকটা হাসল। হাতের কব্জির উপর টোকা দিয়ে চেয়ার থেকে একটু এগিয়ে এল। মনে হল ফিসফিস করে কিছু বলবে। আশফাকও কিছুটা এগিয়ে এল শোনার জন্য। কিন্তু কিছু না বলে মুঠো খুলে অনেকটা ম্যজিক দেখাবার মত একটা ছোট ধাতব শিশি রাখল লোকটা টেবিলের উপর। দেখতে স্টিল মনে হলেও কোটার গায়ে খোদাই করে কিছু লেখা আছে যেটা হালকা নীলাভ আলো ছড়াচ্ছে।

ঃ কি এটা? আশফাক জানতে চায়।
ঃ ন্যানো টেক। হাজার খানেক বছর পরে বাজারে আসবে। লোকটা আবার মৃদু হাসে।
ঃ খুলে বলুন। আমি এখনও কিছু বুঝতে পারছি না। আপনার সমস্যার সাথে এটার কি সম্পর্ক?

একটু নড়ে চড়ে গল্প বলার প্রস্তুতি নিল লোকটা। আশফাক কিছুটা আগ্রহবোধ করা শুরু করেছে। এরকম রোগী আগে কখনো সে পায়নি। ইন্টারেস্টিং কেইস।

ঃ আমি এসেছি এক হাজার বছর ভবিষ্যত থেকে। আমাকে বিশেষ কিছু মিশন দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কাজেই আমি আপনার সময় নষ্ট করব না, নিজেরও না। তার উপর আজকে আবার আপনার বিবাহ বার্ষিকী!

ঃ মানে…? সেটা কিভাবে জানেন আপনি? আশফাক কিছুটা চমকায় মনে মনে। সামনের লোকটার দিকে আবার পূর্ন দৃষ্টিতে তাঁকায়। প্রথমে ভেবেছিল শিক্ষিত, অহংকারী এক সিজোফ্রেনিয়ার রোগী, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে চরম বুদ্ধিমানও বটে।

ঃ জানি… ঐ যে বললাম ভবিষ্যত থেকে এসেছি। বিশেষ কাজে আপনার কাছেই এসেছি।
ঃ মানে টাইম ট্রাভেল করে এসেছেন? আশফাক অবাক না হবার ভান করে। রোগীর কথায় ভূল ধরা বা বাধা দেয়া তার কাজ নয়।
ঃ জ্বী আপনার কাছেই, … আমার দরকার আপনার কাছেই। আর যে বক্সটা দিলাম সেটা আপনার কন্যা লামিয়ার জন্য।
ঃ আপনি আমার কন্যার নাম জানেন, আমার আজকে বিবাহ বার্ষিকী সেটাও জানেন…! আপনি কি আসলে আমার পরিবারের সাথে পরিচিত কেউ? আশফাক এবার অবাক না হয়ে পারে না। আপনাকে কি রিনা পাঠিয়েছে?

ঃ না… আপনার ওয়াইফ আমাকে পাঠায়নি। আমি আপনার কাছেই এসেছি। লোকটার চোখে এবার নীলের আভা কিছূটা বেড়েছে বলে আশফাকের মনে হল।
ঃ কি কাজে, এসেছেন? আশফাকের গলায় কিছুটা সন্দেহ। প্র্যাক্টিকাল জোকের গন্ধ পাচ্ছে সে। বন্ধু-বান্ধব কারো কাজ হতে পারে। আজকাল এটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার কাছের বন্ধুও তো নেই তেমন একটা। তবে এ যে রোগী নয় সেটা আশফাক এতক্ষনে নিশ্চিত।
ঃ আমি এসেছি আপনার সাথে গল্প করতে আর একটা অনুরোধ করতে!
ঃ কি অনুরোধ?
ঃ আজ রাতে আপনি বাইরে খেতে যাবার যে প্লান করেছেন সেটা বাদ দিয়ে বাসায় পরিবারের সাথে থাকবেন, এই অনুরোধ করতে?
ঃ কেন? আশফাক নিশ্চিত এই লোকটাকে তার ওয়াইফ রিনাই পাঠিয়েছে। কারন বাইরে খেতে যাবার প্লান বাইরের কারো জানার কথা না।
ঃ ভবিষ্যতে আপনার কন্যা এমন একটা কিছু আবিষ্কার করবে যেটা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। মানব সভ্যতার জন্যও…। কিন্তু আজ রাতে বের হলে আপনার গাড়ির একটা দূর্ঘটনা হবে। আপনার কন্যাও আপনার সাথে থাকবে, আমরা সেটা চাচ্ছি না।
ঃ আমরা কারা?
ঃ বললাম তো আমি ভবিষ্যত থেকে এসেছি!
ঃ তার মানে আমি বাইরে না গেলে দূর্ঘটনা ঘটবে না? আশফাক এখন আর নোট নিচ্ছে না। বরঞ্ছ কিছুটা মজা পাচ্ছে! সময় থাকলে লোকটার সাথে আরো কিছুক্ষন আলাপ চালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু বাসায় ফিরতে হবে। গ্রীন রোড থেকে এই সময়ে ধানমন্ডি যেতেও প্রায় আধা ঘন্টার বেশি লেগে যাবে।

ঃ আমাকে জানাতে পেরেছেন, সাবধান করেছেন তারমানে আপনার কাজ শেষ…!

ঃ আরেকটু বসুন, আমাদের হাতে সময় আছে। একজন রোগীকে আপনার অন্তত পঁচিশ মিনিট সময় দেয়া দরকার। লোকটা তার হাতের তালুর দিকে তাঁকাল। আশফাক সেখানে একটা ডিজিটাল ঘড়ির মত কিছু দেখতে পেল। হচ্ছেটা কি! কে এই রহস্যময় লোকটা?

ঃ ভবিষ্যত থেকে কারা আপনাকে পাঠিয়েছে?

ঃ আমরা হোমো সুপিরিওর… জানেন নিশ্চই ইভোলিউশনের নানা ধাপ পেরিয়ে হিউম্যান স্পেসিস আজকের হোমো সেপিয়েন্স এর পর্যায়ে এসেছে। আমরা এর পরের স্টেজ হোমো সুপিরিওর। কিন্তু এই ইভোলিউশন প্রকৃতি ঘটায়নি। আমরা নিজেরাই এই ইভোলিউশন তরান্বিত করেছি। সভ্যতার নিয়ন্ত্রন নিজেদের হাতে নিতে এটা করতে বাধ্য হয়েছিল বিজ্ঞানীদের একটা দল। আমি তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছি।

ঃ আমার কন্যার ভূমিকা কি এখানে?

ঃ সেটা বলা যাবে না। শুধু জেনে রাখুন আমাকে সময়ের পেছনে পাঠিয়ে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে আপনার সাথে দেখা করে অনুরোধ করতে বলা হয়েছে। এখানে আসার আগে, আপনার সাথে দেখা করার জন্য প্রবাবিলিটি নিয়ে আমাদের বড় একটা দল প্রায় চার বছর সম্ভাব্য সকল দিক নিয়ে কাজ করেছে… শুধু যেন আমি আপনার সাথে এখানে বসে পঁচিশ মিনিট কথা বলতে পারি ঠিক এই সময়ে।

ঃ তার মানে আমার কন্যা গুরুত্বপূর্ন কেউ? আশফাক কিছুটা হাসে। আমি নিজেও কিন্তু সাই-ফাই মুভির ভক্ত। এক সময় অনেক দেখতাম।

লোকটা এবার হাসল না। শুধু হাতের তালুর দিকে আরেকবার তাঁকাল।

ঃ আমি আপনাকে গল্প বলতে আসিনি। আপনার কন্যা বা আপনি এক হাজার বছর পরে ইতিহাসের কেউ নন। অন্তত আমার জানামতে। কিন্তু যেহেতু আমাকে কাউন্সিল থেকে এখানে পাঠানো হয়েছে, তার মানে টাইম লাইনে আপনাদের বেঁচে থাকাটা নিশ্চই কোন ধরনের পরিবর্তন করে যেটা আমাদের পক্ষে যায়। বাটারফ্লাই ইফেক্টের কথা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন?

ঃ আর কাউকে মেরে ফেলতে চাইলেও কি আপনারা ভবিষ্যত থেকে লোক পাঠাবেন? আশফাক কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে। কিন্তু লোকটা সিরিয়াসলি নেয়।
ঃ অবশ্যই না। আমরা হিটলারকে মেরে ফেলার জন্যও কাউকে পাঠাইনি। আমরা তথ্য দিয়ে ঘটনার গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু সে পরিবর্তনের কাজ এই সময়ের কাউকেই করতে হবে। সরাসরি কোনভাবেই যুক্ত হওয়া যাবে না। তাতে টাইম-স্পেস রিপল তৈরি হবে।

ঃ আহ… বেঁচে গেলাম… তার মানে আপনি আমাকে মেরে ফেলার জন্য কাউকে ভাড়া করেননি। আশফাক কপট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এই লোক প্রলাপ বকছে আর তাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তার পরিবার সম্পর্কে এ জানে কিভাবে সেটাই সন্দেহের বিষয়। পুলিশ ডাকবে নাকি…!

লোকটার চোখে কিছূটা হতাশা দেখা গেল।

ঃ আশফাক সাহেব আমি জানি আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করেন নি। আমি শুধু আমার কাজ করছি। আর পাঁচ মিনিট পরেই আমি চলে যাব। আর আজকে রাতে আপনি যদি আমার কথা অমান্য করেও বাইরে যেতে চান পরিবার নিয়ে, সেটা আপনার ইচ্ছে। কিন্তু কাউন্সিল সর্বাত্মক ভাবে চেষ্টা করবে আপনারা যেন না যেতে পারেন আর আপনার বা আপনার কন্যার যেন কোন ক্ষতি না হয়।

ঃ শুনে খুশি হলাম…।

ঃ আমরা প্রবাবিলিটি নিয়ে কাজ করি। আপনাকে এখানে দেরি করিয়ে দেয়া, আপনার সাথে দেখা করে সময়ের মাঝে সুক্ষ পরিবর্তন করা এসবই আপনার আজকের নিরাপত্তার জন্য। … ঠিক আছে আমার কাজ শেষ আমি উঠি।

ঃ আপনার মেটাল বক্স নিয়ে যান…। আশফাক টেবিলে রাখা ছোট বক্সটার দিকে কলম দিয়ে নির্দেশ করে।

ঃ ওটা আপনার কন্যার জন্য। ১৬ বছর বয়সে তার ক্যান্সার ধরা পড়বে। টাইম সিল করা আছে। শুধুমাত্র আপনার কন্যা লামিয়ার হাতের কাছে এটা তখন নিয়ে গেলেই হবে। …বাকি কাজ ন্যানোটেক করবে। তার আগে আপনি সব ধরনের চিকিৎসা করিয়ে দেখতে পারেন। ……আমরাও চাই লামিয়া ভালো থাকুক।

ঃ বুজরুকি হচ্ছে না…? আশফাক কিছুটা রেগে যায়।

ঃ …স্যুভেনির হিসেবে রেখে দিন! আশফাক কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হন হন করে লোকটা বের হয়ে গেল। পেছনে হতভম্ব আশফাক কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারল না।

⚧⚧⚧⚧⚧—–⚧⚧⚧⚧⚧

ঃ দেরি হয়ে গেল একটু… তোমরা রেডি তো চলো বেরিয়ে পড়ি। উত্তরায় একটা ভালো রেস্টুরেন্ট হয়েছে নতুন। আশফাক ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে।

তার হাত থেকে কেকের প্যাকেটটা নেয় রিনা, “তোমার মেয়েকে জিজ্ঞেস কর আগে, তার মান ভাঙ্গাও গিয়ে”। তোমার না আরো আগে আসার কথা আজকে? এত রাতে উত্তরায় ড্রাইভ করে না গিয়ে কাছে ধারে কোথাও গিয়ে খেলেই হবে। ধানমন্ডিতেও ভালো রেস্টুরেন্ট আছে।

ঃ আর বোলো না, একটা রোগী এসে শেষ সময়ে সব গুবলেট করে দিয়ে গেল। … আর আমাকে ড্রাইভ করতে হবে কেন? আজকে না ড্রাইভারকে বলেছিলাম থাকতে।

ঃ ছিলতো… এতক্ষন। ওর বউ অসুস্থ হয়ে গেছে হটাত করে। তাকে নিয়ে হসপিটালে যাবে তাই চাবি দিয়ে চলে গেল।

এই সময় লামিয়া এক হাতে একটা লাল জুতো নিয়ে ঢুকল।

ঃ বাবা… আমার আরেকটা জুতো খুঁজে পাচ্ছি না… আমি কিভাবে বাইরে যাব?

: তাই নাকি মা…! চলতো খুঁজে দেখি…। অন্য জুতো পরে গেলে হবে না? আশফাক মনে মনে ভাবছে সব ঝামেলা এক সাথেই কেন শুরু হচ্ছে। ড্রাইভারের চলে যাওয়া, লামিয়ার জুতো হারানো… চেম্বারের অদ্ভুত লোকটার কথা আবার মনে পড়ল। নাহ এসব বুজরুকি তে কোন ভাবেই মন দেয়া যাবে না…।

প্রায় আধা ঘন্টা খুঁজেও লামিয়ার জুতোর আরেক পাটি কোন ভাবেই পাওয়া গেল না। শেষে অনেক বুঝিয়ে তাকে যখন রাজি করানো হল বাইরে যেতে অন্য জুতো পরে, ঠিক তখনই আশফাককে হতবাক করে দিয়ে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বছরের এই মৌসুমে এরকম আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টির কোন মানেই হয় না। আশফাক পুরোপুরি হতভম্ব, লামিয়া আর রিনা মনঃক্ষুণ্ণ হল।

সে রাতে আশফাকের পরিবার নিয়ে বাইরে ডিনার করতে যাওয়া হল না আর।

পরদিন সকালে চেম্বারে আসার সময় রাস্তায় একটা ভাঙ্গা, দোমড়ানো মোচড়ানো প্রাইভেট কার দেখতে পেল সে। এ পথেই তার গতকাল ফেরার কথা ছিল। ঝট করে তার আবার সেই অদ্ভুত লোকটার কথা মনে পড়ে গেল। আসলেই কি সত্যি বলেছিল লোকটা!

চেম্বারে ফিরেই টেবিলের উপর সেই স্টিলের শিশিটা দেখতে পেল। যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবে আছে। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। কোন শব্দ নেই, ভেতরে কিছু নড়ছে না। খোলার মত কোন প্যাঁচ বা ক্যাপও নেই। সাবধানে নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে দিল শিশিটা।

⌚⌚ এগার বছর পরে ⌚⌚⌚


লামিয়ার বিছানার পাশে বসে আছে আশফাক। হাতে তার সেই স্টিলের শিশি। নেড়েচেড়ে দেখছে…। দীর্ঘ এগার বছর ধরে যত্ন করে রেখেছে গোপনে এই শিশিটা সে। কাউকেই জানতে দেয়নি এটার কথা। লামিয়ার ক্যান্সার ধরা পড়েছে অনেক আগেই। কিন্তু শেষ রক্ষা হচ্ছে না। যুদ্ধে সব সৈনিক জিতে যাবে এমনটা সব সময় হয় না।

ঃ বাবা…। তুমি ঘুমোও নি…? লামিয়া ক্লান্ত স্বরে বলে।
ঃ নারে… মা। তোর কাছে বসে থাকতে ভালো লাগছে।
ঃ তোমার মন খারাপ হচ্ছে না… বাবা? আমি মরে গেলে খুব কষ্ট পাবে? মাকে দেখে রেখো তুমি।

আশফাক কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছে। এই মেয়ে কিভাবে যেন অনেক বড় হয়ে গেছে, তার থেকেও বড়। মৃত্যুকে কি অবলীলায় মেনে নিয়েছে।

ঃ আজকেই মরে যাচ্ছি না, তুমি ঘুমোও গিয়ে। একটু পরেই সকাল হয়ে যাবে।
ঃ যাবো রে মা…। একটা শেষ চেষ্টা করে দেখতে চাচ্ছি।
ঃ কি চেষ্টা বাবা? তোমার হাতে এটা কিসের শিশি?

আশফাক লামিয়ার হাতে স্টিলের শিশিটা দিলো। তারপর শক্ত করে তার হাত চেপে ধরলো। লামিয়া কিছুটা অবাক, হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে না, তার সে শক্তি নেই।

ঃ কি এটা বাবা… ব্যাথা লাগছে তো।

ধাতব একটা শব্দ হয়ে শিশিটা ভেঙ্গে গেল।

ঃ উফ… বাবা… শিশিটা ভেঙ্গে গেছে, মনে হচ্ছে ভেতরে পিপড়া ছিল আমাকে কামড় দিয়েছে হাতে।

আশফাক মুঠো খুলে শিশিটা দেখল। ঠিক মাঝ বরাবর শিশিটা দু-টুকরো হয়ে গেছে। লামিয়ার হাতের কবজিতে দুটো লাল কামড়ের দাগ। মনে হচ্ছে সুই ফুটানোর মত।

ঃ কিছু না মা… একজন এটা আমাকে দিয়েছিল। তুই যখন ছোট ছিলি তখন, তোকে দেবার জন্য।
ঃ খেলনা দিয়ে খেলার বয়স কি আর আমার আছে বাবা…? এটা কি কোন খেলনা… মনে হচ্ছে বোতলের ক্যাপ।

আশফাক কিছু বলল না আর। বিছানা থেকে উঠে চেয়ারে গিয়ে বসল। “তুই ঘুমো মা… আমি আরেকটু পরে শুয়ে পড়ব।” আশফাকের কেন যেন এখন নিজেকে খুব নির্ভার লাগছে। মনে হচ্ছে তার উপর দেয়া একটা গুরুদায়িত্ব সে শেষ করতে পেরেছে। হোমো সুপিরিওরদের একজনের পিতা সে। অনেক আশা নিয়ে সে সকালের অপেক্ষা করছে।

☯☯☯☯☯☯

মন্তব্য