গল্প

বোকা মানুষ

আমি প্রচন্ড অবাক হয়ে আজমলের দিকে তাঁকিয়ে আছি। এ লোকটা একসময় দোর্দন্ড প্রতাপে এই এলাকায় ঘুরে বেড়াত। ত্রাস সৃষ্টি করেছিল সবার মনে। প্রায় একডজন খুনের মামলা এই লোকের নামে। একটাও প্রমান করা যায়নি। তার ভয়ে এলাকার কয়েক ঘর মানুষ রাতে নিজের ঘরেও ঘুমাতে সাহস পেত না।

আজকে সরকারি মেডিকেলের ফ্লোরে রক্তে ভেজা একটা চাটাইয়ের উপর পড়ে আছে। প্রতিপক্ষের মাছ ধরার বল্লম এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে তার ফুসফুস। সেই ভাঙ্গা বল্লম নিয়েই সে শুয়ে আছে। তার জন্য একটা বেডও পাওয়া যায়নি। তাকে মরতে হবে এই ঠান্ডা মেঝেতে চাটাইয়ের উপর।

আজমল সাহেব কেমন আছেন?

জীবনের প্রতি সব আশা হারানো চোখ নিয়ে আজমল আমার দিকে তাঁকালো।

ভালো না স্যার, মারা যাচ্ছি। হসপিটালের একটা বেডও কপালে জুটল না শেষ বেলায়। আজমলের কথায় মনে হল বল্লমের থেকে তার বেশি আফসোস হচ্ছে এত ক্ষমতা থাকা স্বত্তেও তার একটা বিছানায় মরতে না পারা নিয়ে।

আপনার সাথের লোকজন কই? যেই তিন বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ান?

আর বলবেন না স্যার… আমারে গাঁইথা ফেলার পর হারামাজাদারা নিজের জীবন নিয়ে যে যেদিকে পারসে ভাগসে। যদি বাঁইচা ফিরতে পারতাম… সব কয়টার চামড়া তুলে নিতাম।

আমি অসহায়ের হাসি দিলাম। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে লোকের ইগো সমস্যা থাকে তাকে মানসিকভাবে সুস্থ বলা চলে না।

আজমল সাহেব… আমার পুলিশের জীবনে আপনার মত হারামি লোক আমি একটাও দেখি নাই। একটা কথা কি জানেন… আমি দম নেয়ার জন্য কিঞ্চিত থামলাম, দেখি আজমল কি বলে! সে শ্বাপদের মত জ্বলজ্বল চোখে আমার মুখের দিকে তাঁকিয়ে আছে।

শক্তির নিত্যতা সূত্র আছে একটা, বুঝলেন। আমাদের চেনা মহাবিশ্ব এ নিয়ম মেনে চলে। সৃষ্টিকর্তার দুনিয়াতে এ নিয়মের ব্যাতিক্রম নাই। এ সূত্র বলে শক্তির কোন ধ্বংস নাই, সে শুধু রূপ বদলায়। মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমান তাই নির্দিষ্ট। আমাদের ছোট ছোট জীবনগুলোও তাই। যে পরিমান ভালোবাসা আপনি অন্যের জন্য পোষন করবেন সৃষ্টিকর্তা তা আপনাকে ঠিকই কোন না কোন ভাবে ফেরত দেবেন, এক রুপ থেকে অন্য রুপে। যে পরিমান ঘৃনা আর কলহ আপনি ছড়াবেন তার সমপরিমাণ ঘৃনাও আপনি ফেরত পাবেন। কিভাবে পাবেন সেটা জানি না, কিন্তু প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না।

আজমল কিছু বলল না, তার চোখের কোনে একবিন্দু জল জমেছে। কিন্তু এ লোকটাকে দেখে আমার ঘৃনা বাদে কিছু আসছে না।

আমি জানি স্যার আমি খারাপ ছিলাম, কিন্তু আমার আপনা লোক আমারে এইভাবে একা ফেলে চলে গেল? এদের বিপদে আপদে আমি কি না করসিলাম…। আজমলের শক্তি ফুরিয়ে আসছে, কাশির সাথে রক্ত যাচ্ছে।

আমি হাসলাম… কঠিন ক্রুর হাসি, পনের বছরের পুলিশের এই পেশা আমাকে মাঝে মাঝে প্রচন্ড নির্দয় হবার শক্তি দিয়েছে। শক্তির নিত্যতা সূত্র আজমল সাহেব, আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন। যদিও আমি আপনার ডেথ বেড কনফেশন নিয়ে লাভ নেই, কারন ম্যাজিস্ট্রেট এই রাতের বেলায় আসবেন না, আর সকাল পর্যন্ত যে আপনি টিকবেন না সেটা ডাক্তার সাহেবই আমাকে বলেছেন।

কিছু বলার নাই স্যার…। আপনা লোকদের একজনও এই সময় আমার সাথে হসপিটালে নাই দেখসেন…। আমারে হসপিটালে দিয়া গেল এক রিকশাওয়ালা আর টোকাই … বাইচা থাকলে এদের একটা উপকার করে যেতাম।

আমি আবার হাসলাম। এরা আপনার মত পিচাশ না, কিছু পাবার আশায় আপনাকে এখানে নিয়ে আসে নাই।

ঠিক আছে ভেবে দেখেন মরার আগে কিছু বলতে চান কিনা, আমি দেখি আপনার জন্য একটা বেডের ব্যবস্থা করা যায় নাকি। তবে সেটাতে কোন লাভ আছে বলেও মনে হয় না।

আজমল শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাঁকায়। তার সময় ঘনিয়ে এসেছে। মরার ঠিক আগের মূহুর্তে নাকি মানুষ অদ্ভুত সুন্দর কিছু দেখতে পায়। আজমল মনে হয় এখন তাই দেখছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আজমলের মত পিশাচ শ্রেণির মানুষ মরার আগে কি দেখছে?

আমি হসপিটালের বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরাই। আকাশ গুমগুম করছে যে কোন সময় বৃষ্টি নামবে অন্ধকারে। আজমলের পরিবার কয়দিন শোক করবে, কিন্তু উল্লাসে ফেটে পড়বে এই গ্রামের অনেক মানুষ। একটা মানুষের মৃত্যু কারো কারো হাঁফ ছেড়ে বাঁচার অন্যতম কারন হবে। আনন্দ আর শোকে কাটাকাটি, প্রকৃতির হিসাব খুব সোজা।

মন্তব্য