অন্যান্য

আমার আমি-৪: বাবার মৃত্যু এবং আমার বিষণ্ণতা

বিষণ্ণতা যাকে আমরা সাধারনত ডিপ্রেশন (Depression) বলে জানি, এর ভয়াবহতা কতটা তা কি জানেন? জীবদ্দশায় অনেকেই হালকা বা মৃদু এ বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়েছেন, আবার সেরেও গেছেন। কিন্তু কেউ কেউ দীর্ঘ সময় এ ধরনের রোগে ভোগেন এবং প্রচন্ড অভিমান বুকে নিয়ে দিনযাপন করেন।

মানসিক সমস্যাতে যে ডাক্তারের কাছে যেতে হয় এটা অনেকেই বোঝেন না। আর কেউ বিষণ্ণ থাকলে আমরা তাকে হেলায় উড়িয়ে দেই। আমাদের বাংগালীদের মধ্যে মানসিক সমস্যায় কাউন্সিলিং করা নিয়ে একটা ট্যাবু আছে। মনের আবার রোগ হয় নাকি, আর সেটা হলেও হবে পাগলদের!

জাতিগতভাবে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় আমরা অনেক পিছিয়ে পড়া আর উদাসীন।

আমি প্রথম তীব্রভাবে কষ্ট পেয়েছিলাম যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসি তখন। ভাবতেই পারছিলাম না এই সবুজের আঙ্গিনায় আর কোন অধিকার নেই আমার। ডেইরি গেইট আসলেই ঘুম ঘুম চোখে আড়মোড়া ভেঙ্গে একটা অব্যক্ত অহংকার নিয়ে আর বলা হবে না, “মামা নামার আছে”।

এই বিষণ্ণতা আমার কেটে গেছে, তবে এখনো মাঝে মাঝে ইউনিভার্সিটির বাস দেখলেই মনে চিনচিন করে একটা ব্যাথা লাগে। কাউকে বলতে পারিনা, কারন এই ব্যাথাটা আরেকজন জাবিয়ান বাদে কেউ বুঝতে পারে না।

এরপর দীর্ঘ একটা সময় জীবনের নানা পাঠে নানা জায়গায় ঠকে ঠকে শিখেছি, অপমানিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি, বিষন্ন হয়েছি, আবেগে ভেতরে রক্তক্ষরন হয়েছে, সে ব্যাথাও আবার সেরে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি বিষণ্ণতা আমাকে আক্রান্ত করতে পারেনি। নিজেকে আমি সবসময় প্রবোধ দিতাম এই বলে যে আমি মানসিকভাবে অনেক বেশি পরিপক্ক, যুক্তিবান আর আবেগ নিয়ন্ত্রনে রাখা মানুষ।

কিন্তু সেই আমি দীর্ঘ মেয়াদি বিষন্নতায় আক্রান্ত হলাম আমার বাবা মারা যাবার ঠিক পরপরই। সবসময় যুক্তি আর পজিটিভ মানসিকতার এই আমি হঠাত করে খেই হারিয়ে ফেললাম, আমাকে জালের মত আচ্ছন করে ফেলল এক অবদমিত আবেগ। যে আবেগের কূলকিনারা আমি এখনও ঠাঁই পাই না।

বাবা মারা যাবার ঠিক এক বছর হচ্ছে আজকে। এই একবছরে আমি কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারিনি, মনের ভেতরের গহীন থেকে উঠে আসা চাপা অকারন ক্ষোভ কোনভাবেই চোখের জলে ভাসাতে পারিনি। ঠিক তখনই আমার মনে হয় বাবা চলে গিয়ে আমাকে বড় একা করে দিয়ে গেলেন। আমার কাজকর্মের সবচেয়ে বড় সমালোচক তিনি ছিলেন। এই বিরুদ্ধবাদী মানুষ যে আমার জীবনে কি পরিমান অসীম মমতা রেখে গেছেন তা অগোচরে কখনো বুঝতেই পারিনি।

আমি প্রচন্ড অভিমানী আর আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। আমার এই অভিমান দেখানোর একটা জায়গা ছিলেন আমার বাবা, আমার কিছু প্রমান করতে হলে তার কাছেই প্রমান করার চেষ্টা করতাম আমি। পৃথিবীর আর কাউকে আমার প্রমান করার কিছু ছিল না। হঠাত করে তাই তার এ চলে যাওয়া আমার সেই কাজকর্মে একটা শূন্যতা নিয়ে আসল।

আমি এখনো বিষন্নতায় ভুগছি, কিন্তু আমার হাসিমুখ দেখে কেউ বুঝতে পারে না আমার মন খারাপ পকেটে নিয়ে চলা।

যখন বারান্দায় একা দাঁড়াই মনে হয় পৃথিবীতে আমার করার কিছু নেই, অযথাই সময়ের অপচয় করছি, কিংবা যখন মায়ের সাথে কথা বলি, প্রতিবার আমার চোখ চলে যায় বাবা যেখানটায় বসে থাকতেন সেখানে। আমার সেই জলে ডুবে যাবার, দম বন্ধ হয়ে যাবার অনুভুতি এই একবছরেও কমেনি।

লেখালেখির খুব শখ আমার ছোটবেলা থেকেই, নানা কিসিমিরে সে সব লেখা, সেগুলোতেও মন বসাতে পারছিনা। শুধু মনে হয় অযথাই লিখে চলেছি, কি দরকার?

এ লেখাটাও কেন লিখছি জানি না! হয়ত আমার অবেচেতন মন চাইছে এই বিষণ্ণতা থেকে সেরে উঠতে। আমার মত ইন্ট্রোভার্ট্র মানুষ লিখেই সেটা করতে পারে, তাই আবোল তাবোল লিখে যাই অনবরত। নিজের জন্য লিখি, বেঁচে থাকার জন্য!

এখনো যে পুরোপুরো ভেঙ্গে পড়িনি তার একটা অন্যতম কারন হতে পারে আমার মেয়ে। তার চোখের দিকে তাঁকালেই মাঝে মাঝে মনে হয় বিষন্ন আর বিধ্বস্ত একজন মানুষকে সে দেখতে পাবে। তাই হাসিমুখে অনেক কিছু করে যাই যন্ত্রের মত।

আমি মানুষের অবহেলা দেখি, জগত সংসারের নষ্টামি দেখি, সৃষ্টির সেরা জীব বলে নিজেদের ঘোষিত করা দোপেয়দের ভন্ডামি দেখি, এখন আর আমি অবাক হই না। আমি নির্লিপ্ত ভাবে সব দেখে যাই।

আমি রাতের পর রাত চেয়ারে শুধু চুপ করে বসে থাকি কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ দিয়ে। সেখানে কি হচ্ছে কিছুই মাথায় ঢোকে না। যখন কষ্ট অনেক তীব্র হয়, শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে অর্থহীন বাক্য রচনার চেষ্টা করি। কিন্তু ভেতরটা উগড়ে দিয়ে কারো কাছে বলতে পারিনা আমার মন খারাপ, আমি সব কিছু নিয়ে প্রচন্ড হতাশ। আমি জীবন নিয়ে হতাশ না হয়েও এই অর্থহীন বেঁচে থাকা নিয়ে হতাশ!

এই বিষণ্ণতা, অক্টোপাসের মত রাত গভীর হলেই আমাকে আঁকড়ে ধরে। বিষন্নতার উপসর্গ নিয়ে ঢের পড়া হয়ে গেছে আমার ইতিমধ্যে, নিজের অবস্থা খুব ভালো ভাবেই যাচাই করতে পারছি, কিন্তু সেরে ওঠাটা এত দীর্ঘ হবে এবার সেটা ভাবিনি।

আমি লিখে যাই অনবরত, শুধু একা হলেই মনের গভীর থেকে কেউ একজন আবার বলে ওঠে তোর কেউ নেই, সেই দেয়ালটা নেই যেটা তোর কথার উত্তর দিত, সেই গোপন অভিমান ঢেলে দেবার জায়গাটা নেই, তোকে না বুঝেও বোঝার একটা প্রচন্ড মানুষ ছিল সে আর নেই।

আমি খুব তীব্রভাবে আমার ছোটবেলায় ফেরত যেতে চাই। বাবার কাঁধে চড়ে স্কুল, এক টাকার কাঠি আইসক্রীম, ফে্লে আসা শৈশবের রাস্তা, পলাশীর আগুনঝরা কৃষ্ণচূড়ার টানেল, আমি আবার সব কিছুতে ফেরত যেতে চাই। আমার দারিদ্র আমাকে ভোগায় না, মাথার ভেতরের যে ঘুণপোকা প্রতিদিন আমাকে বলে চলে তুই একা একা একা… সে আমাকে ভোগায়।

আমি আপেক্ষিকতার সূত্র একবার বদলে দিয়ে হলেও আবার সেই শৈশবে ফিরতে চাই, আমার সেই চোখ রাঙ্গানো মানুষটার কাছে।

আমার বিষণ্ণতা যায় না, আবেগী মানুষের ভীষন সমস্যা, আমার আমি এভাবেই বেঁচে আছি। বুকের ভেতর দলা পাকানো একটা অব্যক্ত ব্যার্থতা নিয়ে। নিজেকে বুঝতে না পারার অহেতুক কষ্ট নিয়ে।

মন্তব্য