অন্যান্য

আমার আমি-৩: সেপিওসেক্সুয়াল চিন্তা ভাবনা

বেশিরভাগ মানুষই বিপরীত লিঙ্গের চেহারার সৌন্দর্য, দেহের আকার কিংবা তাদের বাইরের চাকচিক্য যেমন পোষাক, মেকআপ কিংবা সামজিক অবস্থান দেখে আকৃষ্ট হয়। এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু সবাই কি তা হয়? সেপিওসেক্সুয়াল (sapeosexual) মানুষজন কিন্তু এই হিসেবের বাইরে। দৈহিক আকর্ষন অল্পবিস্তর থাকে, কিন্তু এই ধরনের মানুষের কাছে সেটাই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না। এরা আকৃষ্ট হয় বিপরীত লিঙ্গের বুদ্ধিমত্তা, দর্শন, জীবনের গভীর উপলব্ধির উপর।

নিজেকে আমি এই শ্রেনীতে ভাবতে পছন্দ করি।

আমি হুট করে কারো ভক্তিতে গদ্গদ হয়ে যাই না। কাউকে নিজের আদর্শ মানতে আজও আমি নারাজ। একসময় আমি মনে করতাম এগুলো বোধহয় আমার ইগো সমস্যা। পরে ভেবে দেখলাম আমি সবার সাথেই খুব বিনয়ী আচরন করি যদি না সে চরমভাবে মিথ্যেবাদী হয়।

বন্ধুমহলে যখন মেয়েদের নিয়ে স্বস্তা রসিকতা হয় সেটাতেও আমি কখনো যোগ দেই না। পরীমনি কি করল না করল, কোন নায়িকা কার সাথে সময় কাটাল, তাতে সমাজ বা ধর্মের কি ক্ষতি হয়ে গেল – এ ধরনের স্বস্তা আলোচনা আমাকে টানে না। এমনকি হালের জনপ্রিয় ইংলিশ লীগ কিংবা ক্রিকেটারের দেশপ্রেম নিয়েও আমার আলোচনা করতে ভালো লাগে না।

আমার আমি এরকমই। আমি নির্লিপ্ত একজন মানুষ। ইন্ট্রোভার্ট যাকে বলে সেটা নই, কিন্তু আপনার আলোচনার বিষয় আমার দার্শনিক বুদ্ধিমত্তায় যদি কড়া না নাড়ে তবে আপনার সাথে আমার জমবে না।

সমস্যা হচ্ছে আমার আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষই এ সকল জিনিস নিয়ে ব্যাস্ত। আমি খুব অবাক হয়ে মাঝেমাঝে ভাবি যারা পরকিয়া করে কিংবা বহুনারীগামী তাদের কি মানসিক বা দৈহিক কোন একধরনের চাহিদা পূরন হচ্ছে না দেখেই তারা এই কাজটা করে?

পরকিয়া করতে না পারলে অন্তত তারা রস্তাঘাটে উঠতি বয়সী মেয়েদের বুকের দিকে তাঁকিয়ে থাকবে। বাসে ট্রেনে একটু গা ঘেষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। আমি আশেপাশে বের হলে এধরনের মানুষই অকাতরে দেখে থাকি। এদের বেশিরভাগই ধর্মপ্রান, গনতন্ত্রের অনুসারী আর দিনশেষে হয়ত বড়সড় নারীবাদীও।

আমি খুব আক্ষেপ নিয়ে অনেককে বলে থাকি আমি আজ পর্যন্ত বুদ্ধিমতি কোন নারী দেখিনি। এরা সবসময় ব্যাস্ত থাকে জীবনের ছোটখাট খুচরো হিসেব নিয়ে। সুন্দর দেখেছি, চালাক দেখেছি, কাজে পটু দেখেছি কিন্তু যে জিনিসকে বলে বিজ্ঞ সেটা দেখিনি। হয়ত একারনেই তাদের প্রতি আমার আকর্ষন ছোটবেলা থেকেই অনেক কম। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় আমি তাদের এড়িয়ে চলেছি।

আমার কাছে সবথেকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি হল, একই রুমে আপনাকে যদি বোকা কিছু মানুষের সাথে কয়েক ঘন্টা সময় অতিবাহিত করতে হয় সেটা। আমি পারিবারিক বেশিরভাগ সমাবেশে তাই বেমানান। উদারতা যেখানে নাই, যেখানে সারাদিন তেল, নুন আর চিনির হিসাব চলে, সময় কাটে অন্যের দোষ বলে, সেখানে সময় ব্যয় করা অর্থহীন। এই ক্ষুদ্র পৃথিবীর জীবনের একটা দীর্ঘ সময় এরা ব্যয় করে এসব অহেতুক কাজে।

সেপিওসেক্সুয়াল মানুষের একটা বৃত্ত আছে, এই বৃত্তের ভেতরে তারা হুট করে কাউকে ঢোকায় না। একবার সেই জায়গায় ঢুকতে পারলে আপনি তাদের মনে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নিতে পারবেন। তাদের সাথে ওঠা বসা সব কিছু চলবে আপনার কিন্তু কখনই তারা আপনাকে বুঝতে দেবে না আপনি তাদের জীবনে ঐচ্ছিক একটা মানুষ এবং আপনার সংগ তার পছন্দ নয়।

বেশিরভাগ গবেষক, কবি, লেখক একারনেই খুব একটা জনসমাবেশে থাকতে পছন্দ করেন না। যারা করে তারা হয় অভিনেতা না হয় স্বস্তা ভাঁড়ামোতে ব্যাস্ত। তাদের যা বলার আর করার সেটা তাদের কাজের মাধ্যমেই প্রকাশ করেন। এরপর আপনার সাথে ঘন্টা ব্যাপি কারো ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে সমালোচনা করার সময় বা ইচ্ছা তার থাকে না।

কিছুটা আবেগহীন বলা চলে আমাকে, কারন স্বস্তা আবেগে ভেসে গিয়ে যুক্তির ধার কমানো আমার পক্ষে সম্ভব না। আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি, দামী পোষাক, পদ-পদবী আমাকে টানে না। একজন সেপিওসেক্সুয়ালের কাছ থেকে আপনার সম্মান পেতে হলে বুদ্ধিমান হতে হবে, উদার হতে হবে।

মন্তব্য