।। এক ।।

সেদিন ফোনে কথা হচ্ছিল কন্যার সাথে। তার অভিযোগ তাকে কেউ ভালোবাসে না। বাবাও না, মা-ও না।

ঃ কেন? তোমার মনে হল কেউ তোমাকে ভালোবাসে না?
ঃ আমার সাথে তুমি খেল না।
ঃ খেলি তো, তুমি বললেই তো খেলি।
ঃ নাহ, তুমি শুধু সারাদিন কম্পিউটার টেপ, আর হু… হু… কর। আর… আর… আমি খেলতে বললেই বল, ” আমি কাজ করি না…।”

একটু বিরতি দিয়ে, ” কাজতো আমিও করি… খেলাটাও তো একটা কাজ…। তোমার কাজ আছে আমার কাজ নাই?

ঃ বাবা, যে তোমাকে খেলনা কিনে দেই, ঘুরতে নিয়ে যাই… বাইরে যাই, বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
ঃ না… কেউ আমাকে ভালোবাসে না।

আলিনা অধ্যায় - ৬ 1

আমার কিছুটা মন খারাপ হয়। ভালোবাসার সংজ্ঞাটা একেকজনের কাছে একেক রকম। কারো কাছে টাকাটাই ভালোবাসা, কারো কাছে পরিবার, আবার কারো কাছে নেশা।

বয়সের সাথে সাথে এই ভালোবাসাটা আবার পরিবর্তন হয়ে যায়। ব্যাক্তি থেকে বস্তুতে, বস্তু থেকে স্থানে পরিবর্তন হয়। একটা বয়সে মানুষের ভালোবাসা এসে জমা হয় তার জাগতিক বস্তুতে এবং তার বাসস্থানের উপর। নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে বুড়ো লোকজন এই কারনেই খুব বেশি দূরে যেতে চান না।

আমি এখনও সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেই মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের উপর। কন্যার এই অল্প বয়সেই আমি যতটুকু পেরেছি তার সাথে সময় ব্যায় করেছি। কোথাও একা গেলেও একটু পরপর তার কথা মনে হয়।

কিন্তু সেটা বোঝার মত বয়স তার এখনও হয়নি। তার ভালোবাসা এখনও সীমাবদ্ধ খেলনায়। কিন্তু আমি তাকে অভিজ্ঞতা দিতে চেয়েছি, বস্তু নয়। বস্তুর বিনাশ আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তর করি।

আলিনা অধ্যায় - ৬ 2
শিশুরা বড় হয়ে যায় আর আমরাও তাদের সাথে সাথে আবার বড় হই।

।। দুই ।।

কন্যা ছড়া গানের জন্য মেডেল পেয়েছে স্কুলে। স্কুলে থেকে ফিরেই আমাকে ফোন করে জানাচ্ছিল।

ঃ বাবা… দেখ আমি মেডেল পেয়েছি। টিচার আমাকে মেডেল দিয়েছে।

আমি ঘুমের ঘোরে বললামঃ -” হুঁ…”

ঃ খুব ভালো হয়েছে মা, সুন্দর হয়েছে… দাঁড়াও বাবা তোমাকে ভিডিও কল দেই।

ফোন কেটে যতবারই ফোন দেই কন্যা আর ফোন ধরে না। ভিডিও, অডিও কোনটাতেই তার মান ভাঙ্গে না। আমি তার মাকে ফোন দিয়ে বললাম ঘটনা কি?

ঃ ও তোমাকে এত উতসাহ নিয়ে একটা জিনিস দেখাল আর তুমি শুধু হুঁ…হুঁ বলেছ এই কারনেই তার রাগ।

আমি কিছুটা বিরক্ত হলাম। পরিমিতিবোধ আর সহমর্মিতা অনেক বড় একটা গুন। এটা আয়ত্ত্বে আনতে হয়। কখন রাগ করতে হবে আর কখন করতে হবে না সেটা জানা না থাকলে বড় ঝামেলা।

এই ছোট্ট জীবনে আমাদের বেশিরভাগ সময় চলে যায় একজন আরেকজনের উপর অহেতুক রাগ আর অভিমান করেই। অভিমান শুধু ভালোবাসাকে কমিয়েই দেয়না, মাঝে মাঝে তিক্ততাও ঘটায়।

কন্যার রাগ অভিমান বেশি হচ্ছে। আদর করার মানুষ বেশি তো হয়ত তাই। কিভাবে কম আদর দিতে হয় আমি তা জানি না। সে শুধু মাত্র তার মায়ের শাসন মানে। বাকিদের থোড়াই কেয়ার করে।

অনেক আগে আমার মা একটা কথা বলেছিল, ” যেদিন নিজে বাপ হবি, সেদিন বুঝবি বাপ-মায়ের অন্তরে কি থাকে”। কিছুটা কি বুঝতে পারি এখন?

তাইতো পৃথিবীর সব বাবা-মাকে দেখলেই কেমন যেন একটা শ্রদ্ধা আসে এখন মনে। কেন যেন মনে হয় এক বুক কষ্ট রেখেও এই বাবা/মা – টা আরেকটা পৃথিবী আলো করে রাখার মিশনে নেমেছে।

।। তিন ।।

“তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।”

এটা নেপোলিয়নের বহুল প্রচারিত বানী, আদতেও সেই লোক এটা বলেছিল কিনা আমার জানা নেই। তখনকার সময়ে যুদ্ধবাজ একটা লোক এই কথা বলবে বলে আমার বিশ্বাসও হয় না।

যেই বলুক, কথাটা সত্যি। আলিনার বর্ণমালার হাতেখড়ি তার মার কাছ থেকে। ধর্ম শিক্ষাও মার কাছ থেকে। কারন বাবার জ্ঞানী-জ্ঞানী উত্তর আলিনার পছন্দ না। পড়াশোনা আসলে বাবার ভালোও লাগে না।

আমার মা অল্প শিক্ষিত ছিলেন। খুব বেশিদূর তিনি আমাকে পড়াতে পারেন নি। তবুও আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় মার কাছে পড়তে বসার কথা। ভাসা ভাসা সেই স্মৃতি আর স্কেলের বাড়ি।

আলিনা এই দিক দিয়ে ভাগ্যবান। তার মা উচ্চশিক্ষিত। তার শৈশব স্মৃতি আরো বেশি জোরালো আর আনন্দদায়ক হবার কথা। সেখানে যদিও বাবার অংশ খুব কম থাকবে। কারন বাবা প্রথাগত শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন।

আমি মনে প্রানে চাই আমার কন্যার প্রিয় শিক্ষক হোক তার – “মা”।

আলিনা অধ্যায় - ৬ 3
প্রতি বইমেলায় আলিনা এবং তার মা আমার সাথে যায়। বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গজাবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। কিন্তু মাথায় কিছু স্মৃতি রয়ে যাক।

আমি নিশ্চিত আমার কন্যার এখন যা বয়স, তাতে সে বড় হবার পর এই সকল সার্টিফিকেট গত শিক্ষার কোন মূল্য থাকবে না। পৃথিবীতে এখন যে অবারিত তথ্যের যুগ চলছে তাতে আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই বদলে যাবে দুই-দশকের মধ্যে। ততদিন শুধু আমাদের সন্তানদের অসভ্য প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।


আজকে আসলে হাবিজাবি নানা কথা মনে আসছে। পৃথিবীর সব বুদ্ধিমান দেশ যেখানে করোনা ভাইরাস (COVID-19) আতঙ্কে লক-ডাউন অবস্থায় আছে আমাদের দেশে তা নিয়ে চলছে রঙ তামাশা। এর মূল কারনও শিক্ষা। আমাদের লোকজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। এরা ভাইরাস এপিডেমিক কি তা বোঝে না। আপাত দৃষ্টিতে অদৃশ্য এই ক্ষুদাকার প্রান হোস্ট দেহে (মানুষ) কি বিপুল বিক্রমে আক্রমন চালায় তার কোন ধারনা এদের নাই। পানি-পড়া আর সার্জিকাল মাস্কের পেছনে এরা দৌড়াচ্ছে।

আদতেই আমাদের কিছু করার নাই। সৃষ্টিকতার কাছে প্রার্থনা করা বাদে। একটা কথা মনে পড়ে গেল “Never underestimate the power of a group of STUPID people“.

বিজ্ঞানের দোষ নেই। যে পৃথিবীতে ডাক্তার বা বিজ্ঞানীর থেকে আপনি বেশি গুরুত্ব আর অর্থ ব্যায় করবেন সেলেব্রেটি আর খেলোয়াড়দের পেছনে, সেখানে প্রকৃতির রুদ্র রোষে প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

Survival of the Fittest” এর খেলা শুরু করে দিয়েছে মাদার নেচার। আর প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নেয় তখন ব্যাক্তি বিশেষ এর উপর নেয় না, নেয় প্রজাতির উপর।

লেখালেখির শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। তখন বিভিন্ন দেয়ালিকা আর কিশোর পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার ফেরা লেখালেখিতে। মূদ্রনে ভীষন অনীহা আমার। প্রযুক্তি সেই সুবিধা দিয়েছে আমাকে। প্রযুক্তি প্রেমিক বলে আমার লেখায় বারবার চলে আসে এই বিষয়গুলো। আমার সাহিত্য ভাবনা, ঘোরাঘুরি আর কিছু ছবি নিয়ে। একদম সাদামাটা একজন মানুষের মনের কোনে কি উঁকি দেয়?

Leave a Reply