অন্যান্য

আলিনা অধ্যায় – ১০

|| এক ||

আলিনা দু’টো স্বপ্ন দেখেছে। ঘুম থেকে উঠার পর চিন্তিত গলায় সেটাই আমাকে জানাচ্ছে।

প্রথম স্বপ্নে, দাদা রাজু চাচ্চুকে বকা দিচ্ছে কবুতর পালার জন্য আর ক্রিকেট খেলার জন্য। এটার ব্যখ্যা পাওয়া যায় মোটামুটিভাবে। আমার পিতা মানে আলিনার দাদা মারা গেলেও তার স্মৃতি এখনও আলিনার মনে কিছুটা রয়ে গেছে। বড় হতে হতে হয়ত ফিকে হয়ে আসবে।

দ্বিতীয় স্বপ্নে, আমরা তিনজন… মানে বাবা, মা আর আলিনা একটা জায়গায় যাচ্ছিলাম। কিন্তু মা আর বাবা আলিনাকে ফেলে অনেক দ্রুত চলে যাচ্ছি। আলিনা কিছুতেই আমাদের সাথে থাকতে পারছে না, কারন তার হাটার গতি অনেক কম। আর মার কোলে আরেকটা অন্য বাবু রয়েছে!

দুটো স্বপ্নে সে দু-দিন দেখেছে। আমি প্রথম স্বপ্নের কিছুটা ধরতে পারলেও পরেরটার কিছুই বুঝতে পারিনি! পরে হটাত করে মনে হল, সেদিন বিকেলে রেষ্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে পাশের টেবিলের একটা বাচ্চা খুব হাটাহাটি করছিল। মাত্র হাঁটা শিখেছে বোঝা যায়। আমাদের টেবিলের কাছে আসলে আলিনার মা তাকে কোলে নিয়ে একটু আদর করে দিয়েছে।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে আলিনার স্বপ্নের ব্যখ্যা। এরপর তার অবধারিত প্রশ্ন-

ঃ বাবা, শুধু আমি কেন স্বপ্ন দেখলাম। তুমি কেন দেখতে পাওনি?
ঃ কারন আমাদের সবার অভিজ্ঞতা আর দর্শন আলাদা।

ঃ মানে…?
ঃ মানে আমরা দুজন দুই সময়ে ঘুমিয়েছিতো তাই।

ঃ তুমি স্বপ্ন দেখ না… বাবা?
ঃ না রে মা।
ঃ কেন? আলিনার অবাক ভাব।
ঃ বাবা অনেক বেশি লজিক্যাল মানুষ হয়ে গেছিতো তাই… বড় হয়ে যাওয়ার খারাপ ইফেক্ট।

আলিনা গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ে, কি বুঝেছে কে জানে!
ঃ তুমি মনে হয় স্বপ্ন দেখে ভুলে যাও। বড় হলে অনেক কিছু মনে থাকে না…।
ঃ তাও হতে পারে মা…।

|| দুই ||

কঠিন কথা বাদ যাক, কিছু সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি। পারলে জবাব নিজেই খুঁজে নিন। বাচ্চারা যখন প্রশ্ন করে তখন জগতের মূল বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করে। যেমনঃ –

– ঘাসের রঙ সবুজ কেন?
– সূর্য পূর্বদিকে কেন ওঠে?
– পৃথিবী কে বানিয়েছে?
– মরে গেলে আমরা কোথায় যাই?
– ইউনিভার্স কত বড়?

এরাই যখন স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, এই প্রশ্নগুলো আর তাদের মাথায় থাকে না। তাদের এই প্রশ্ন করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে যায়। সমস্যা তদের বড় হয়ে যাওয়াতে নয়। গলদ আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থায়। নইলে একটা বাচ্চা অবলীলায় সৃষ্টি রহস্যের যে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নগুলো করে তা বড় হতে হতে আর করতে চায় না কেন?

আমরা কোথাও একটা বড়সড় সমস্যা বাঁধিয়ে ফেলেছি। মানুষ হিসেবে এভাবে বড় হওয়াটা বোধহয় প্রকৃতি আমাদের জন্য চায়নি। চারিদিকে এত এত দাতব্য সংস্থা, তারপরেও পৃথিবী থেকে দূর্ভিক্ষ দূর হয়না। এমন কোন শতাব্দী আমরা পার করিনি যখন যুদ্ধ হয়নি, মানুষ মরেনি।

অগুনিত ভালো মানুষী অনলাইনে দেখা গেলেও সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে দূর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি দেখতে হচ্ছে কেন? কারন আমরা শিখিনি, যেটা শেখার দরকার ছিলো সেটা আমাদের শেখানো হয়নি। না স্কুল, না কলেজ, না বিশ্ববিদ্যালয়, না ধর্ম – কোন কিছুই আমাদের প্রকৃতির সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি।

একটাই প্রজাতি কাল্পনিক বর্ডার বানিয়ে খুন করে চলেছে অকাতরে।

|| তিন ||

মোবাইল স্ক্রীন থেকে কিছুটা দূরে রাখার জন্য হলেও মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ি সময়ে অসময়ে। নিজের কাজ গুছিয়ে সময় বের করা ইদানিং কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটাও জানি এই বয়সের স্মৃতি রয়ে যাবে অবচেতনে আজীবন। আমাদের এই ২১শে ফেব্রুয়ারিতে লক্ষ্য ছিল ধানমন্ডি লেক – কিন্তু সেটা কোনভাবেই আলিনার জন্য ভালো স্মৃতি হতে পারবে না। অগুনিত মানুষ আর কারো স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই (বাঙালীর কোন কালেই ছিল না)!

আলিনা অধ্যায় - ১০ 1

বইমেলা হচ্ছে না, কি ভীষন একটা যন্ত্রনা। বাজার-ঘাট, পিকনিক, ভ্রমন, বাস সব খোলা… শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর তার সাথের কার্যক্রম গুলো বন্ধ। ঘোড়ার ডিমের স্বাস্থ্য সচেতন আমাদের দেশের মানুষ। সব কিছু চলছে সব কিছুর নিয়মে শুধু বই নিয়ে কারবার বন্ধ। শেখা যাবে না, শেখানো যাবে না। এ এক অদ্ভুত স্বদেশ।

ফের সেই বদ্ধ রেস্টুরেন্ট আর আমাদের নকল শহীদমিনারে ছবি তোলা।

আলিনা অধ্যায় - ১০ 2

এ জন্যেই বলি, আমাদের সন্তানেরা স্কুলে যা শিখছে তার থেকে বেশি শিখছে অনলাইনে। আর তাদের সব থেকে বড় শিক্ষক হচ্ছে ইউটিউব। প্রযুক্তি তার থাবা দিয়েছে, আপনার বালির বাঁধ আর অহেতুক মূল্যবোধের মূলা খুব বেশিদিন ঝুলিয়ে রাখতে পারবেন না।

প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে প্রযুক্তি প্রেমিক আর নিয়ন্ত্রক হিসেবে। নয়ত প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রন করা শুরু করবে আপনার জীবন। ভেবে বলুনতো হাতের মোবাইলটি বাদে কতক্ষন আপনি থাকতে পারেন? মোবাইলে চার্জ না থাকলে অস্থির হয়ে যান কিনা?

অথচ এটা আপনার হৃদপিন্ড নয়। এটা ছাড়াও আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন।

শুভ দিনের কামনায়, তারার সন্তানেরা প্রকৃতিকে ভালোবাসুক।

মন্তব্য