দেশ ভাবনা

যে ভাষায় কথা বলি, স্বপ্ন দেখি

ফেব্রুয়ারী আসলেই সবার মাঝে ভাষা নিয়ে অত্যন্ত সচেতেনতা দেখা যায়। সে ভাষা বাংলা ভাষা। তারা এমনভাবে কথা বলেন যেন বাংলা বাদে অন্যান্য ভাষা ব্যবহার করাটা পাপ! কথাটা এভাবে না বললেও পারতাম, কিন্তু এই অতি সচেতনতা যখন বছরের বাকিটা সময় দেখা যায় না, এবং তারা ইংলিশ ব্রেকফাস্টের সাথে চাইনিজ ডিনারের ছবি ফেইসবুকে/সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে বেড়ান তখন মর্মাহত হননা। বরঞ্চ এটাই নিয়ম, এটাই মানুষের স্বভাব। আমাদের অতিসচেতনতা আসলে একধরনের “দেখিয়ে দিলাম একদিন” এই মনোভাবের ফসল।

ভাষা দিবস আসে আমাদের মনে করিয়ে দেবার জন্য, যে ভাষায় তুমি কথা বল একদল সাহসী লোক তার জন্য নিজেদের জীবন দিয়ে গেছেন। তারা এই ভূ-খন্ডের বাংলা ভাষাভাষীদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলনে নেমেছিলেন। তখনকার শোষন শুধু ভাষার জন্য ছিলনা, ছিল আত্মমর্যাদারও বটে। আমরা সবদিকেই শোষিত আর অবহেলিত হচ্ছিলাম। ভাষার উপর আঘাত দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার অপচেষ্টা তার মধ্যে সবথেকে নিকৃষ্টতম। সে ভাষা আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিনত হয়েছিল। রক্ত ঝরিয়ে হলেও বাঙ্গালী বুঝে নিয়েছিল নিজের অধিকারের জন্য লড়তে হয়।

ভাষা তোমার, আমার, সবার বলার অধিকার। যে মুক ও বধির কথা বলতে পারে না বা শুনতে পারে না, তারও একটা নিজস্ব ভাষা আছে। যে শিশু আজকে জন্ম নেবে সেও যেন একটা বলার মাধ্যম পায়, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সেই কথাই বলে।

বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারী যে চিৎকার এদেশের মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল তার অর্থ একটাই ছিল, চাইলেই তুমি কারো মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে পারো না, আইন করে চাপিয়ে দিতে পারো না বিজাতীয় ভাষা।

২১ তাই সব জাতির, সব সত্ত্বার নিজেদের ভাষার অধিকার দৃপ্ত স্বরে ঘোষনা করে। ২১শে ফেব্রুয়ারী তাই একসময় হয়ে যায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমাদের সীমানা ডিঙিয়ে সেটা হয়ে যায় পৃথিবী নামক গ্রহের ভাষা বুঝে নেয়ার দিন।

তাই বলে কি নিজেদের ভাষা নিয়ে গর্ব থাকবে না?

অবশ্যই, এই বাংলা ভাষায় আমি যেভাবে বুঝি পৃথিবীর আর কোন ভাষা সেভাবে বুঝি না। এর একমাত্র কারন বাংলা ভাষায় সবকিছু অনুভব করা যায়। এই ভাষায় আমি কবিতা লিখি, গল্প লিখি, পড়ি, গান শুনি, প্রেমের কথা বলি, রাগি, হাসি, দরকারে গালিও দেই। এ অনেকটা বাতাসে শ্বাস নেবার মত। সবসময়ই নিচ্ছি কিন্তু এক মূহুর্তের জন্যও মনে হচ্ছে না অপরিচিত কিছু দেহের ভেতরে যাচ্ছে।

ভাষাও অনেকটা সেরকম, যে ভাষায় জন্ম থেকে কথা বলি, হাসি-রাগ করে তার কদর হুট করে বোঝা যায় না, ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন না অন্যদেশে যাবেন, অন্য ভাষার লোকের মাঝে আপনাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সেখানে বাংলা বলার জন্য তাইতো মনটা আকুপাকু করবে।

ভাষা আপনার বলার মাধ্যম, আপনার নিজকে প্রকাশ করার ইচ্ছা। তাই ভাষা নিয়ে অতিসেচেতনতা বা স্মার্টনেস দেখানোর চেষ্টা ছাড়ুন। পৃথিবীর মধ্যে কিছু জিনিসকে আপনি আটকে রাখতে পারবেন না। তাদের মিশ্রন আর পরিবর্তন হবেই। ভাষা আর সংস্কৃতি তার মধ্যে পড়ে।

আপনি ভালো ইংরেজী জানেন, বেশ। কিন্তু এটা কোনভাবেই আপনার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করতে পারে না। আপনার আমেরিকান উচ্চারন বা বৃটিশ উচ্চারন প্রমান করেনা আপনি সমাজের উচ্চ শ্রেনীর। যদি আপনার মনোভাব এরকম হয়ে থাকে তবে মানসিক ভাবে আপনার পরিপক্কতা আসেনি।

আমার ছোট্ট মেয়েটাও জানে কারো ইংরেজী উচ্চারন নিয়ে হাসাহাসি করতে হয় না। এটা একমাত্র তারাই করবে যারা ইংরেজীকে যোগ্যতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেছে। চিন্তা করে দেখুনতো, একজন বিদেশী আমাদের দেশে এসে যখন ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায়, ভুল বাক্যে আমাদের সাথে কথা বলে তখন আমাদের চেহারায় কতটা উজ্জ্বলতা চলে আসে! আমরা হাসাহাসি বা তাকে শুধরে দেবার থেকে তাকে উতসাহটাই দেই বেশি।

আপনি যখন ভুল ইংরেজী, জাপানী, ফ্রেঞ্চ বা হিন্দিতে কথা বলবেন তখন সে দেশের মানুষ আপনাকে নিয়ে হাসবে না, বরঞ্চ আপনি নিজের ভাষা বাদেও আরেকটি ভাষা জানেন বা বলার চেষ্টা করেন সেটাকে সাধুবাদ দেবে।

আমাদের ইংরেজী মাধ্যম স্কুলগুলো অদ্ভুত কারনে ভাষাগতভাবে এই মাটির সন্তানদের দূর্বল করে ফেলে। বাংলাকে তারা প্রাধান্য কম দেয় বলেই এখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা অনায়াসে বলে আমি বাংলায় দূর্বল। তাদের বাবা-মারা খুব আহ্লাদ নিয়ে বলে, আপা কি যে করি বলেন, মেয়েটা বাংলাটা একদমই ভালো পারে না।

কি মারাত্বক, কি লজ্জার। এ মাটির সন্তান নাকি বাংলা পারে না। যে ভাষায় সে স্বপ্ন দেখে সে ভাষায় নাকি সে দূর্বল! কি বিচিত্র আমাদের মনোভাব।

এরা আসলে ইংরেজীকে লাট সাহেবের আর কুলীন শ্রেনীর ভাষা ধরে নিয়েই সন্তানকে বাংলা মাধ্যমের বদলে ইংরেজী মাধ্যমে দেন। একটু বেশি খরচ করে হলেও তারা এসি রুম আর ইট কাঠের মাঝে বন্দী করে ফেলেন তার সন্তানকে।

আমাদের সন্তানেরা সাধারনত তিনটা ভাষা শেখে- বাংলা, ইংরেজী আর অল্প কিছু আরবি। এর বাইরে গিয়েও অনেকে জাপানী, ফ্রেঞ্চ, চাইনিজ ইত্যাদি শেখে জীবিকার প্রয়োজনে।

ভাষা নিজেকে প্রকাশ করার আর অন্যকে বুঝে নেয়ার মাধ্যম। এটা কোনভাবেই আপনার কৌলিন্য প্রমান করে না। কাজেই এদেশে জন্মে বাংলায় দূর্বল হওয়াটা আপনার জন্য লজ্জার, এটা আপনার প্রথম ভাষা। এটা আপনার বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

নিজের ভাষা শেখার পরে আপনি আরো ভাষা শিখতে পারেন সেটা আপনার দরকারে। কিন্তু বিজ্ঞান চর্চা করতে, গনিত শিখতে আপনি নিজের ভাষাতেই পারবেন। মহাবিশ্বের ভাষা গনিত পৃথিবীর সব ভাষাতেই একই রকম ফলাফল দেবে।

ইন্টারনেটের এই যুগে বাংলায় সাবলিল হবার আগেই আমার কন্যা ইংরেজীতে নিজেকে সাবলীল মনে করছে। তাই তার মায়ের অনিচ্ছা থাকা স্বত্তেও আমি মেয়েকে বাংলা মাধ্যমে দিয়েছি। চেয়েছি যে মাটির সন্তান সে, সেখানকার জল-কাদামাটি গায়ে মেখে বড় হোক। বাংলা ভাষাকে ভালো বাসুক।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে বাংলা আর ইংরেজী মিশিয়ে, কিংবা ভুল বাংলা উচ্চারনে, অথবা ইংরেজী অক্ষরে বাংলা উচ্চারন লিখে থাকে, এটা দেখতে ও পড়তে বেশ দৃষ্টিকটু।

কিছু শব্দ আমরা অন্যভাষা থেকে বাংলায় নিজেদের মত করে নিয়েছি। সেগুলোর বাংলা না করলেও চলে। টেবিল কে টেবিলই বলুন কোন সমস্যা নেই, কিন্তু যখন আপনি বলবেন, আমার সামার একদম লাইক হয় না, বা আমি ম্যাঙ্গো খুব লাইক করি, – তখন ধরে নিতে হবে আপনি বাংলা এবং ইংরেজী দুই ভাষাতেই দূর্বল। আপনি এখনো পঞ্চম শ্রেনী পাশ করার যোগ্যতা রাখেন না।

ভাষার এরকম দূষণ নিন্দনীয়। সঠিকভাবে চর্চা করুন, চেষ্টা করুন। নিজের ভাষায় “মাগো” বলে একবার ডাক দেবার পিপাসা অন্যভাষা দিয়ে মেটে না।

পৃথিবীর কোন ভাষাই ছোট নয়, অসুন্দর নয়। ভাষা দিবসে তাই সবাইকে নিজের মাতৃভাষা নিয়ে সচেতনতার সাথে অন্য ভাষাকেও সম্মান করার কথা বলি।

২১ আমাদের সেই অহংকারে মনে করিয়ে দেয়, সবার বলার অধিকার আছে। একদল সূর্য সন্তান সে অধিকারের জন্য বেয়নেট আর বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। তুবুও সেদিন তার নিজের ভাষার সম্মান লুটাতে দেয়নি।

সকল ভাষা শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

মন্তব্য