আলিনা অধ্যায় ২৫: ছায়া মানুষ

Apr 3, 2025আত্মকথন, সাহিত্য0 comments

“বাবা জানো…আমাদের বাংলা মিস ক্লাসে মোবাইল দ্যাখে!”

আমি কিছুটা চমকাই। আলিনা সচরাচর তার ক্লাসের গল্প আমার সাথে করে না। অভিযোগ দেয়ার মত কিছু আসলে মেয়েটা আমাকে সহজে বলতে চায় না। তবে সে এটা অভিযোগের সুরে বলেনি। অনেকটা স্বগোক্তির মত করে বলেছে। আমি তার অভাবের কথা শুনতে চাই, অভিযোগের জবাব দিতে চাই। আমি আমার জ্ঞান আর উপলব্ধি গুলো তার সাথে ভাগাভাগি করতে চাই।

কিন্তু আমি চাইলেই হবে না। সেটা তাকেও গ্রহন করতে হবে। তাই মাঝে মাঝে সে যখন কিছু জিজ্ঞেস করে আমি উৎসাহের চোটে অনেক বেশি বলে ফেলি। কিন্তু একটু পরেই আবার নিজের ভূল বুঝতে পারি। প্রতিটা বয়সের বোঝার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমার বিশ্বাসগুলো বড় হবার সাথে সাথে যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, এটা আলিনার ক্ষেত্রেও হবে। দরকার সময়ের আর সঠিক শিক্ষকের।

বাচ্চারা যা দেখে তাই শিখে। আমার করা কাজগুলো আমার মেয়ে অবচেতনেই অনুসরন করবে। তাকে আলাদা করে শেখাতে হবে না। আমি যদি রাস্তায় ময়লা ফেলি, সেও একসময় তাই করবে। যতই বইপত্রে লেখা থাকুক না কেন যত্রতত্র ময়লা ফেলা অনৈতিক।

– মোবাইল কেন দ্যাখে?
– আমাদের লিখতে দিয়ে মিস বসে বসে মোবাইলে ফেইসবুক চালায়।
– ফেইসবুক চালাতে তুমি দেখেছ?
– না, কিন্তু সে ফেইসবুক চালায় মনে হয়।

আমি জবাব দিলাম না। ক্লাসে মোবাইল চালানো একটা অদ্ভুত রকমের অন্যায় এটা আলিনা জানে। ফেইসবুক চালায় না ভিডিও দেখে এটা আলিনা না জেনে বলেছে।

যে কোন কাজের মাঝখানে মোবাইল দেখার অর্থ হল সেই কাজে আপনার মনোযোগ নেই। কারো সাথে যখন কথা বলছেন বা আড্ডা দিতে গেছেন, তখন অকারনে মোবাইল হাতে ধরে রাখবেন না বা চোখের সামনে তুলবেন না। সাধারণ মানব মস্তিষ্ক মাল্টি টাস্কিং এর জন্য প্রস্তত নয়। এটা একধরনের অভদ্রতাও বটে।


আলিনা তার মায়ের নানু বাড়িতে বেড়াতে গেছে। যদিও আমি চাইনি ঈদের এই সময়ে সে গ্রামে যাক। কিন্তু আমার অনিচ্ছাতেও অনেক সময় অনেক কিছু ঘটে। সেখান থেকে ফিরে এসে সে আমাকে বলল, বাবা জানো, গ্রামে কেউ দরজা বন্ধ করে না। আর না বলেই হুট করে ঘরে ঢুকে যায়।

– সেটা কিরকম?
– ধর তুমি ড্রেস চেইঞ্জ করছ একজন না বলেই ঢুকে গেছে ঘরের ভেতর। তারপর আবার জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে।

– ওহ…। শহরে বড় হওয়া আলিনা প্রাইভেসি জিনিসটা কি জানে। সে ধরে নিয়েছে এই নৈতিক আইন সবাই মানবে।
– গ্রাম অনেকটা এরকম মা। কারো বাড়িতে ঢুকতে কেউ বিশেষ অনুমতি নেয় না। ওরা অনেকটা বিশাল পরিবারে মত থাকে।

গ্রামের আরো গল্প হয়ত আলিনার কাছে আছে, কিন্তু সে আমাকে বলবে না।

আমরা শিশুদের শেখাতে চাই নিজেদের সেরাটা। ভালো স্কুলে দেয়ার জন্য আপ্রান চেষ্টা চালাই। কিন্তু নিজেরা শিখতে চাই না। কিন্তু আমরা ভুলে যাই আমরা যদি না শিখি তবে বাচ্চারা আমাদের থেকে কি শিখবে? প্রতিটা বাচ্চার সাথে তার অভিভাবক ছায়া মানুষ হয়ে রয়ে যাবেন অনেকদিন পর্যন্ত। এই ছায়া মানুষের ধ্যান ধারনা, বিশ্বাস আর যুক্তি তার সন্তান বয়ে বেড়াবে আজীবন।

একটা মানুষের বাচ্চাকে যে পরিমান যত্নে বড় করতে হয়, আগলে রাখতে হয়, পৃথিবীর আর কোন প্রজাতির বাচ্চাকে কে এতটা যত্ন নিয়ে লালন পালন করা হয় না।

আলিনা অধ্যায় ২৫: ছায়া মানুষ 1

0 Comments

মন্তব্য

দেলোয়ার জাহান

মনের একান্তে কিছু কথা থাকে যা কাউকে বলা যায় না। বলতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায় আমাকে। সে সকল হাবিজাবি জীবন দর্শন আর কিছু অসময়ের কাব্য নিয়ে আমার লেখালেখির ভুবন।

Pin It on Pinterest

Share This