স্কুল নিয়ে আমি অনেক কথা লিখেছি, আমার স্বপ্নের ইউটোপিয়ান স্কুলের কথাও বলেছি। যেহেতু সেরকম স্কুল পাওয়াটা সম্ভব নয়, আমাদের যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। স্কুলের প্রান তার ছাত্র-ছাত্রী আর শিক্ষকেরা। যদিও বর্তমানের স্কুলে অর্থযোগের সম্ভাবনা না থাকলে কোন শিক্ষকই ক্লাস নিতেন না। তারা আসেন সময় ব্যয় করে অর্থ আয় করেন, চলে যান। কিছু শিক্ষক খুব দূর্দান্ত ক্লাস নেন বলেই আজও কিছু মেধাবী তৈরি হয়, যারা মুখস্ত বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে সরকারী পরীক্ষায় বসে।
আমরা ধরেই নিয়েছি যারা প্রতিযোগিতা করে প্রথম বা দ্বিতীয় হবে তারা মেধাবী। আর বাকিরা বোকা হারু পাট্টি। মুখস্তবিদ্যাকে যেদিন থেকে জ্ঞানের মাপকাঠি হিসেবে ভাবা শুরু করেছি, আমাদের পেছন দিকে যাত্রা তখনই শুরু হয়েছে।
জাতি গঠনের মূল কাজ শুরু হয় স্কুল থেকে। আমাদের সেখানে খুব গলদ আছে। শিক্ষকতা মহান পেশা হলেও এখন যারা আসেন তারা মহত্ত্ব নিয়ে আসেন কিনা তাতে আমার ভীষণ রকমের সন্দেহ আছে! স্কুল, কোচিং, গাইড বই, এক্সট্রা ক্লাস – সব কিছুই আমাদের দেশে ব্যবসার একটা অংশ। একটা সার্টিফিকেট এর আশায় এই প্রানান্তকর চেষ্টা আর রেজাল্ট ভাল করে এরকম স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করার জন্য অভিভাবকের যুদ্ধ – সব কিছুই মনে করিয়ে দেয় আমরা শেখার জন্য আসি না। আমাদের উদ্দেশ্য থাকে বিনিয়োগকৃত অর্থ উদ্ধারের জন্য নাম্বারপত্র যোগাড় করা।
আমাদের সন্তানেরা আনন্দের সাথে শেখে না। তারা অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেদের সময় আর পিতামাতার অর্থ বিনিয়োগ করে। সেই যে ভাল নাগরিক তৈরি করা, যারা ট্যাক্স দেবে, কেরানি হবে আর সরকারের গোলামী করবে – এই বৃটিশ মাইন্ডসেটের বাইরে এখনো আমাদের দেশ যেতে পারেনি। ক্রিটিকাল থিংকিং তাই এই দেশে খুব বিরল।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের জন্য খুব অশান্ত সময়। আমার এই সিরিজের লেখা যেহেতু রাজনৈতিক বিশ্লেষন করার জন্য লিখি না তাই সে আলাপ বাদ রাখলাম।

বেগম রোকেয়ার কথা মনে আছে? একশ বছর আগে যিনি তৎকালীন সমাজের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নারী শিক্ষার পেছনে যথেষ্ট অর্থ আর শ্রম ব্যায় করেছিলেন? কলকাতাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল। তাকে নিয়ে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে অল্পবিস্তর পড়লেও ২০২৫ এর শেষ দিকে এসে খুব আলোচনা হচ্ছে। কারন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক বলেছেন, বেগম রোকেয়া কাফির, মুরতাদ।
পদার্থ বিজ্ঞান পড়ানো একজন শিক্ষক হঠাৎ করে মোল্লাদের মত কথা কেন বলবেন? তিনি যদি অতি ধার্মিক হয়ে থাকেন তবে তিনি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়েন কেন? হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি, হকিং এর রেডিয়েশন, আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতা ইত্যাদি নানা বিষয় পড়লে তিনি জানতেন – এগুলোর প্রবক্তা সবাই নাস্তিক, মুরতাদ। পৃথিবী আগাচ্ছে এই সকল কাফির আর মুরতাদদের হাত ধরেই।
হয়ত বেগম রোকেয়ার মত নারীরা না থাকলে আজকে স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনি মেয়েদের দেখতে পেতেন না বা তাদের সংখ্যা খুব নগন্য হত। এরপরও বেগম রোকেয়ার মুর্যালে আরেক নারীই কালি লেপে দেয় শুধু মাত্র ধর্মীয় হিংসার বশবর্তি হয়ে।

ইন্টারনেটের এই যুগে এখন আর কোন পুরুষকে নারীবাদী হবার দরকার নেই। এই কাজের প্রতিবাদ মেয়েরা নিজেরাই করতে পারবে। তারা যদি ইতিহাস থেকে না শেখে, প্রতিবাদ না করে, তবে আজীবন অন্য কেউ তাদের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন বানিয়ে রাখবে।
একশ বছর পরে এসেও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন বেগম রোকেয়া কে তুচ্ছ জ্ঞান করেন, তখন এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এমনিতেই কমে আসে। সব শিক্ষকই মহান এই তথ্য ভূল।
আলিনার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ২০২৫ তার জন্য একটা চমৎকার বছর হতে পারত। কিন্ত মায়ের অসুস্থতার কারনে তাকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে এই সময়। বাসা থেকে হাসপাতালে তাকে নিয়ে যেতাম মাঝে মাঝে মার সাথে দেখা করতে। মেট্রোরেলে করে আমাদের সেই যাত্রা খুব আনন্দদায়ক না হলেও শিক্ষামূলক ছিল।
আমার সাথে গেলে তাকে সাধারণ কামরায় চড়তে হত। আর মায়ের সাথে চড়লে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত কামরায় চড়ে যেতে পারত। আলিনা তখন আমাকে কিছু দরকারী তথ্য দিয়েছে। যেমনঃ- মেট্রোরেলে মেয়েদের কামরায় শব্দ অনেক কম হয়। যারা দাঁড়িয়ে থাকে তারা অল্পস্বল্প কথা বললেও যারা বসে থাকে তারা কোন কথা বলে না।
স্কুলে তার পরিবেশ দেখার পরিধি আগের থেকে বড় হয়েছে। শেষবার পরীক্ষার খাতা দেখতে যাবার সময় সে আমাকে জানিয়েছে – ক্লাসের জানালা দিয়ে নিচে একটা বাসা দেখা যায়। সেখানে হাঁস আছে, একটা বেড়াল আছে। একটা পুকুরের মত ডোবা আছে। অনেক চড়ুই পাখি দেখা গেছে গাছে। বেড়ালটা চুপি চুপি গাছে উঠে চড়ুই ধরতে চায়।
আমি বললাম, পড়াশোনা বাদ দিয়ে জানালা দিয়ে চেয়ে থাকো নাকি সারাদিন?
– নাহ, আমিতো টিফিনের সময় দেখেছি। তবে ক্লাসের একটা মেয়ে আছে সে সারাদিন জানালা দিয়ে বাইরে তাঁকিয়ে থাকে।
– ওর মনে হয় ক্লাস ভাল লাগে না। তোমার কি ক্লাস করতে ভালো লাগে?
– নাহ, আমারও ভাল লাগে না।
আমার মনটা কিঞ্চিত খারাপ হয়ে গেল। সবসময় ক্লাস করতে ভাল না-ই লাগার কথা। কিন্তু ক্লাসে আসতে হবে কারন শিখতে হবে, আর সবচেয়ে বড় কথা ক্লাসে বন্ধুরা থাকে। ক্লাস ভাল না লাগলে পড়ায় মন বসে না।
আলিনার ক্লাসে যে জিনিসটা অপর্যাপ্ত সেটা হচ্ছে আলো। স্বল্প আলোর কারনে আমি নিশ্চিত অনেক বাচ্চারই বোর্ডের লেখা দেখতে সমস্যা হয়।
স্কুলের প্রিন্সিপাল মহোদয় কি ক্লাসে এসে কখনো দেখেছেন তার স্কুলের বাচ্চাদের সমস্যা কি কি? আমার মনে হয়না এই ভদ্রলোক দায়িত্ব পালনে খুব পটু।
যারা আমার “আলিনা অধ্যায়” পড়েন তারা নিশ্চয়ই জানেন আমি আসলে আলিনার গল্প বলার আড়ালে অন্যকিছু বলি। আমি সমাজের কথা বলি, শিক্ষার কথা বলি, আমাদের সমাজের রুঢ় বাস্তবতার কথা বলি। উপদেশ দিতে চাই না। কারন মানুষ উপদেশ পেতে পছন্দ করেনা। ইদানিং খুব ক্লান্ত লাগে এইসব নিয়ে কথা বলতে। একটা জাতি কিভাবে পেছনের দিকে লাফ দেয় সেটা দেখছি ২০২৫ সালে এসে। বাঙালী হিসেবে গর্ব করার মত কিছু পাচ্ছি না। অতীব শিক্ষিত লোকেরাও একটা সংকীর্ন মানসিকতায় নিজেদের ঢেকে ফেলেছে।
শেষ করি আলিনার সারকাজম করা দিয়ে।
আলিনাকে নিয়ে একদিন চোখের ডাক্তারের কাছে গেলাম। ফেরার পথে একটা দোকান থেকে বিরিয়ানির গন্ধ পেয়েছি। আমি তখন বললাম, “I want to have Chicken Biryani today.” – এটার বাংলা বলতে পারবে?
আমি আসলে দেখতে চাইছিলাম, আলিনা চিকেন বিরিয়ানি কে বাংলায় “মোরগ পোলাও” বলে কিনা সেটা! আলিনা অবশ্য অনুবাদের ধার দিয়েও গেল না। সে বলল, এর অর্থ হচ্ছে “আজকে তোমার খুশির দিন। আজকে তুমি ভাত খাবে না।”






0 Comments